ফাইল ছবি

দেবযানী সরকার, কলকাতা: বাবুল সুপ্রিয় একজন স্টেজ পারফরমার। গান গাওয়ার সময় হাজার হাজার শ্রোতাকে মাতিয়ে রাখতে জানেন তিনি। জানেন মঞ্চটাকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। সে কারণে একসময় বহু ‘ঝুল’ প্রোগ্রামকেও নিজের ক্যারিশমায় হিট করিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুমুল বিক্ষোভেও সেই ‘শো-ম্যান’ বাবুলকে দেখা গেল।

বৃহস্পতিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন এবিভিপির অনুষ্ঠানে গিয়ে একদল অতি বামপন্থী পড়ুয়ার প্রবল বিক্ষোভের মুখে পরেন বাবুল। ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুধু শোনেননি, বিক্ষোভকারীদের হাতে কিল, চড়, ঘুসিও খেয়েছেন। কিন্তু ভুল করে একবারের জন্যও মাথা গরম করেননি তিনি। উপাচার্যের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্যও খারাপ ব্যবহার করেননি। কারণ তিনি জানতেন, খারাপ ব্যবহার করা মানেই পাতা ফাঁদে পা দেওয়া। যা ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধেই যেতে পারত৷

আরও পড়ুন : ‘পুলিশের কাজ রাজ্যপাল করেছে’ অমিত শাহকে চিঠি দিলীপের

বৃহস্পতিবার, দুপুর থেকে ডাক্তার কে পি বসু মেমোরিয়াল হলে আটক থাকার পর সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ যখন তিনি কোনওক্রমে বেরোলেন তখন তাঁকে ধাওয়া করেন বিক্ষোভরত ছাত্র-ছাত্রীরা। পাশেই ছিল মিডিয়ার একটি ওবি ভ্যান। প্রায় দৌড়েই গাড়ির কাছে চলে যান বাবুল। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর ওই ওবি ভ্যানের উপর উঠে বসে পড়েন। সমস্ত বিক্ষোভরত ছাত্র-ছাত্রীরা তখন ঝেঁটিয়ে চলে আসে সেখানে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকেন তারা। অনেকেই আবার তাঁকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাবুল ছিলেন একদম ‘কুল’। প্রথমে কিছুক্ষণ গাড়ির বনেটের উপর শুয়েছিলেন তিনি। তারপর উঠে বসেন।

এরমধ্যেই গান শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীরা । বাবুলও একদম স্টেজ পারফরমারের স্টাইলে বিক্ষোভকারীদের গানের সঙ্গে সঙ্গে হাতে তালি দেন। সুর মেলান নিজেও। ছাত্র- ছাত্রী উদ্দেশে বলেন, “তোমরা সুরে গাও। বাংলা গান গাও। আমিও তোমাদের সঙ্গে গাইছি।” কখনও বিক্ষোভকারীদের সিঙাড়া খাওয়াতে চেয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। বলেছেন, “তোমরা চাইলে আমার গান গাওয়ার পয়সায় আমি তোমাদের সিঙাড়া খাওয়াতে পারি।” যদিও কটাক্ষের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভকারিরা। কিন্তু বাবুলকে তাঁরা দমাতে পারেনি। গাড়ির বনেটের উপর কখনও শুয়ে, বসে, কখনও দাঁড়িয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন বাবুল, আবার মিডিয়াকে বাইটও দিয়েছেন। শুধু বার বার নরম অথচ দৃঢ়ভাবে একটা কথা বলে গিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে এসব করে কোনও লাভ নেই। কোনও কিছুই তাকে ‘উত্যক্ত’ করতে পারবে না।

মিডিয়ার ওবি ভ্যানের উপর প্রায় একটা ঘন্টা এভাবেই কাটিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। ওই সময় বাবুলকে দেখে একবারের জন্য মনে হচ্ছিল না যে তিনি চার, পাঁচ ঘণ্টা ধরে প্রবল বিক্ষোভের মধ্যে আটকে রয়েছেন। একজন স্টেজ পারফমারের মতই ওই এক ঘন্টা তিনি বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের তৈরি করা মঞ্চটাকে নিজের মত করে ব্যবহার করেছেন। ওই সময় মিডিয়ার সমস্ত ফোকাস তাঁর উপর ছিলেন। সেটা বুঝেই বারবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিজের নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে বলছিলেন, “আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না আপনাদের। এরা কেউ জঙ্গি নয়। ঘুরে দাঁড়ান। ওদের দিকে দেখুন। ওদের যেন কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে।” মিডিয়াকেও বারবার বলছিলেন, “আমি এখানে নিজের পাবলিসিটি করতে আসিনি। আমার কিছু হয়নি। আপনারা ওদের দিকে দেখুন দয়া করে।”

আরও পড়ুন : ওবি ভ্যানের উপর বসে বিক্ষোভকারীদের ‘সুরে’ গান গাইতে বললেন ‘কুল’ বাবুল

তাঁর একটাই বক্তব্য ছিল, এই বিক্ষোভের মধ্যে থেকে বেরোনোর জন্য তিনি নিজের নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্য নেবেন না। কারণ এটা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপার। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বেরোতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশকেই তাঁকে সাহায্য করতে হবে।

২০১৪ সাল থেকে পুরোপুরি রাজনীতির পরিবৃত্তে রয়েছেন বাবুল সুপ্রিয়। আসানসোলের দু-দুবারের সাংসদ তিনি। যাদবপুরের ঘটনায় এদিন তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতার প্রকাশ পেয়েছে। এদিন বাবুল সুপ্রিয়কে দেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাজ্য বিজেপির অনেক নেতাই যদি যাদবপুরে এমন বিক্ষোভের মুখে পড়তেন তাহলে নির্ঘাত তাঁরা মাথা গরম করে ফেলতেন। আর তাতে আরও বড়সড় একটা বিপত্তি ঘটতো। বিক্ষোভ আরও কিছুদিন চলতো। কিন্ত বাবুল এরাজ্যে নিজের দলের অনেক নেতাদের থেকে বেশি ও তাড়াতাড়ি রাজনৈতিক কৌশলটা রপ্ত করে নিয়েছেন। মাথা ঠান্ডা রেখে এদিন যেভাবে বাউন্সার সামলালেন তিনি তাতে বাবুল সুপ্রিয়র উপর মোদী-শাহর ভরসার জায়গাটা আরও পোক্ত হল।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ