দেবময় ঘোষ, কলকাতা: লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী বাংলায় হিংসার পর-পর ঘটনার মধ্যেই বিজেপি সদস্যপদ বাড়ানোর কর্মসূচি শুরু করতে চলেছে ৬ জুলাই – ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে৷ সারা দেশেই সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি-কর্মসূচীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানকে৷ বাংলাই যে তাঁর কাছে ‘পাখির চোখ’ – শুরুতেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন শিবরাজ৷ বলেছেন, মমতা (বন্দ্যোপাধ্যায়) আটকালে দেখা যাবে, (সদস্যপদ সংগ্রহের) অভিযান তো চলবে৷

তবে বঙ্গের গেরুয়া রাজনীতিতে শিবরাজের আগমণ শুধু কী মমতাকেই চিন্তায় রাখবে? তা হয়তো নয়৷ গেরুয়া শিবিরেই দুই ব্যক্তি শিবরাজের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকবেন, তাঁরা হলেন – মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা বাংলা বিজেপির প্রধান পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং কৈলাস ঘনিষ্ট দলের নির্বাচন ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক মুকুল রায়৷ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও যা বলছেন বা গেরুয়া শিবিরের অন্দরেও যা ফিসফাস, বাংলায় শিবরাজের প্রতিটি পদক্ষেপই নজরে রাখবেন কৈলাস এবং মুকুল৷

বাংলায় যারা সংগঠনের দায়িত্বে রয়েছেন শিবরাজ সিং চৌহান মূলত তাদের মাধ্যমেই কাজ করবেন৷ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং তাঁর সাধারণ সম্পাদকরা রাজ্য বিজেপির ৪২ লক্ষ সদস্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে শিবরাজের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন৷ সেখানে সংগঠন গঠনে মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন এই মুখ্যমন্ত্রীর একটি মতামত দেওয়ার জায়গা তৈরি হবে৷

অনেকেই বলছেন, বাংলায় শিবরাজের আগমণ চক্ষুশূলের কারণ হতে পারে কৈলাস এবং মুকুলের৷ একই ভাবে তা-ই উপভোগ্য দৃশ্য হতে পারে রাজ্য বিজেপির সহ পর্যবেক্ষক অরবিন্দ মেননে এবং অরবিন্দ ঘনিষ্ট দিলীপ ঘোষের জন্য৷ উল্লেখযোগ্য, ‘মালয়লি’ অরবিন্দও মধ্যপ্রদেশ থেকেই এসেছেন৷ কিন্তু মধ্যপ্রদেশের গেরুয়া রাজনীতিতে কৈলাস বিজয়বর্গীয়র অবস্থান অরবিন্দ মেনন এবং শিবরাজ সিং চৌহানের বিপরীতেই – তা অনেক আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে৷ প্রশ্ন উঠেছে, বাংলার রাজনীতিতে বাংলার রাজনীতিতে মধ্যপ্রদেশের আপাত দুই বিরোধী শিবিরের সমাবেশ কেন ঘটেলেন সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ?

বিজেপি সূত্রে খবর, দল তিন বছর অন্তর ‘মেম্বারশিপ ড্রাইভ’ বা সদস্যপদ বাড়ানোর কর্মসূচির ডাক দেয়৷ এবছর তা দেখবেন শিবরাজ৷ কিন্তু অমিত শাহ’র নির্দেশ – বাংলা, ওড়িশা, তামিলনাড়ুতে বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে৷ সেক্ষেত্রে বাংলায় কাজ করতে হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েত তৃণমূলস্তরের বুথ সংগঠনকে উড়িয়ে দিয়েই তাঁকে কাজ করতে হবে – তা ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছেন শিবরাজ৷ কিন্তু তিনি জানেন কাজটা সহজ নয়, শুধু মিসড কল দিয়েই সদস্যপদ বাড়ালে এবার চলবে না৷ বাড়ি বাড়ি সদস্যপদ সংগ্রহ করতে হবে৷ সেক্ষেত্রে রাজ্য বিজেপির সংগঠন যারা চালান, তাদের সাহায্যের প্রয়োজন৷ গেরুয়া রাজনীতির হাঁড়ির খবর যারা রাখেন, তাদের বক্তব্য, বাংলায় কৈলাস শিবির লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফলাফল করে দেখিয়েছে৷ কিন্তু অমিত শাহ মনে করেছেন, শিবরাজ বাংলায় মাথা গলালে, দলেরই ভারসাম্য বাড়বে৷ কারণ, তার কানে এসেছে বাংলায় প্রার্থী নির্বাচনে মুকুল-দিলীপ শিবির একমত হতে পারেনি৷

রাজ্যে মুখ্য পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের সঙ্গে অরবিন্দ মেননের ‘অম্লমধুর’ সম্পর্ক বিজেপি সমাজে সর্বজনবিদিত।
ওই মালায়লি বিজেপি নেতার সঙ্গে কৈলাসের জুটি কী রকম জমবে তা নিয়ে সবসময় আশঙ্কায় থাকেন বিজেপি নেতারা। মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) মেননকে দিল্লিতে ডাকা হয়েছিল ২০১৬ সালে। বর্তমানে, দলের দফতর এবং প্রকল্প বিষয়ক কাজকর্মের ইনচার্জ তিনি। মেনন এবং বিজয়বর্গীয়র সম্পর্কের ‘কেমিস্ট্রি’ নিয়ে অবশ্য জল্পনার শেষ নেই। অনেকেই বলছেন, শিবরাজ সিংহ চৌহানের সঙ্গে বিজয়বর্গীয়র দ্বন্দ্বের সূচনাপর্বে ছিলেন মেনন। দুজনের দূরত্ব বাড়াতে তিনি নাকি অনুঘটকের কাজ করেছিলেন।

যা শোনা যায়, (১) মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে নাকি নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন কৈলাস৷ ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি শিবরাজের মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী ছিলেন৷ কিন্তু পরবর্তিকালে. শিবরাজ এবং অরবিন্দ মেনন তাকে পার্টির ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চান৷ (২) ২০১৪ সালে কংগ্রেস শিবরাজের বিরুদ্ধে ব্যাপম কেলেঙ্কারির কালি ছেঁটাতে শুরু করে৷ শোনা যায়, সেই সময় কৈলাস শিবরাজকে ছাপিয়ে অগিয়ে আসার চেষ্টা করেন৷ কিন্তু শিবরাজকে সেই আশু বিপদ থেকে বাঁচান অরবিন্দ মেনন৷ সেক্ষেত্রে, বাংলার গেরুয়া রাজনীতিতে মেনন-শিবরাজ কী করছেন তার দিকে কৈলাস কড়া নজর রাখবেন – তা-ই মনে করা হচ্ছে৷ কিন্তু দুই বিবদমান শিবিরকে মাঠে নামিয়ে অমিত শাহ কী ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিলেন – তা সময়ই বলবে৷