সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ভারতবর্ষের প্রথম নির্বাচন দেখেছিলেন। দলীয় রং কোনও দিনই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। লেখার টেবিলেই ঘাড় গুঁজে থাকতে ভালবেসেছেন চিরকাল। কোনও দিন নিজের ভোট নষ্ট করেননি। আসন্ন লোকসভা নির্বাচন ঘিরে খোলামেলা আড্ডায় তাঁর মুখোমুখি Kolkata24x7

প্রশ্ন: এবার ভোট দেবেন তো?
শীর্ষেন্দু: আমি কখনও ভোট মিস করি না। এবারও ভোট দেব। রোদ চড়া থাকলে সকাল সকাল যাব। কিন্তু ভোট অবশ্যই দেব। আমার মনে হয়, প্রতি নাগরিকেরই ভোট দেওয়া উচিত। প্রথম ভোট দেওয়ার সময় সমাজ বদলে দেওয়ার বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু বয়স বাড়লে বুঝেছি আমার একটা মাত্র ভোটের গুরুত্ব খুব বেশি নয়।
কারণ, আমার একটা ভোটে খুব বেশি কিছু ওলট পালট হয়ে যাবে না।

প্রশ্ন: ইদানীং অনেক শিল্পী-সাহিত্যককে সরাসরি রাজনীতির ময়দানে দেখা যায়। আপনার কখনও তেমন ইচ্ছে ইয়নি?
শীর্ষেন্দু: এই ব্যাপারটা আগেও ছিল। আমি রাজনীতির লোক নই। আমার বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সিপিএমের হয়ে প্রচারে বেরোত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সঙ্গে এক গাড়িতে। আমার কোনও দিন তেমন ইচ্ছে হয়নি। সুনীল আর আমি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি বহুদিন। সেই সময় আমাদের নাম এক সঙ্গে
উচ্চারিত হত। অনেকে ভাবত সুনীল যখন প্রচারে গিয়েছে, তখন নিশ্চয়ই আমারও সায় আছে। কিন্তু সেটা একেবারেই নয়। রাজনীতি আমাকে কোনও দিন টানেনি।
আমি লেখালিখি নিয়ে থাকতেই ভালবাসি।

প্রশ্ন: নন্দীগ্রামের ঘটনার পর তো আপনি ধিক্কার মিছিলে হেঁটেছিলেন।
শীর্ষেন্দু: সেটা ছিল অরাজনৈতিক মিছিল। গভীর দুঃখ থেকে একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম।

প্রশ্ন: আপনি স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন দেখেছেন।
শীর্ষেন্দু: ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় আমার বয়স অল্প ছিল। প্রথম সংবিধান প্রবর্তন হল ১৯৫০ সালে। তার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৫১ সালে প্রথম নির্বাচন। তখন বেশির ভাগ মানুষ ছিল নিরক্ষর। ফলে প্রার্থীর বদলে চিহ্ণের গুরুত্ব ছিল বেশি। চিহ্ণ দেখেই ভোট দিত সকলে। এখন রাজনীতির আসর অনেকটা পালটে গিয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে কোনও দিন নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি। চাইওনি। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের কখনও কখনও রাজনীতিক করে দেয়।

প্রশ্ন: সেই সময়ের কথা আরেকটু কিছু বলুন
শীর্ষেন্দু: বাবার চাকরিসূত্রে যখন অসম, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রেলশহরে ছিলাম, তখন ভোটের উত্তেজনা তেমন টের পাইনি। কলকাতায় এসে বুঝেছি, ভোট কাকে বলে! ভোট ঘিরে এত বাগবিতণ্ডা ছিল না। পাঁচ বা ছয়ের দশকে গণ্ডগোল হত ঠিকই। তবে আজকের মতো মানুষের মৃত্যু হত না। রাজনীতিতে গায়ের জোরের দাপট চিরকালই ছিল। গোপাল মুখুজ্জ, রাম চাটুজ্জে, ভানু, জগা এ রকম নামের কিছু গুণ্ডা ছিল। কিন্তু এঁদের পকেটে পিস্তল বা আগ্নেয়াস্ত্র থাকত না। যত বড় গুন্ডাই হোক, লাশ ফেলার প্রবণতা ছিল না।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম ভোটের স্মৃতি?
শীর্ষেন্দু: প্রথম ভোটের সেন্টার পড়েছিল সংস্কৃত কলেজে। প্রথম ভোট দেবার একটা রোমাঞ্চ কাজ করেছিল শরীরে ও মনে। এই ভেবে যে, আমিও দেশের নাগরিক। আমাকেও তাহলে একজন নেতা বা নেত্রীর প্রয়োজন আছে! সেই সময় ভোট দেওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ছিল একুশ।

প্রশ্ন: ছাপ্পা ভোট হত তখন?
শীর্ষেন্দু: তখন ছপ্পা ভোটের সুদিন ছিল। কারণ সেই সময় সচিত্র ভোটার কার্ড ছিল না। মিডিয়ার কড়া নজরদারি ছিল না এখনকার মতো। অনেকেই বুথে গিয়ে জানতে পারত তাঁর ভোট পড়ে গিয়েছে! আশ্চর্য হয়ে এই ছাপ্পা ভোট দেখতাম! দেখতাম, একজন ভোটের কালি মুছে আবার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছে। ছাপ্পা ভোট দেখাটা আমার কাছে এডভেঞ্চারের মতো ছিল। কম বয়সে ছাপ্পা ভোট দেবার জন্য আমার ডাক পড়েছিল। অন্য একজনের ভোট, তাঁর নাম ভাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট দলের প্রতীকে ব্যাটল বাক্সে গলিয়ে দিতে হবে– এই ছিল প্রস্তাব। ছাপ্পা ভোট দেবার জন্য রাজিও হয়েছিলাম। কিন্তু বয়সটা এতই কম ছিল যে, শেষ পর্যন্ত আমাকে কাজে লাগানো
হয়নি। সে এক মজার কাণ্ড!