প্রসেনজিৎ চৌধুরী: জরুরি অবস্থা জারি হয়নি তখনও। তবে দেশজুড়ে একটা কী হয় কী হয় ভাব চলছিল। ১৯৭৫ সালেই ইন্দিরা জমানা। তৎকালীন বিহারে হয়েছিল চিরুডি গণহত্যা। তাতেই জড়িয়ে গিয়েছিলেন গুরুজি-শিবু সোরেন। ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। এই ঘটনার মাস ছয়েকের মধ্যে জারি হয়েছিল জরুরি অবস্থা। ২০০৪ সালে সেই চিরুডি গণহত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে আত্মগোপনে যাওয়া, পরে জেল- সবই ঘটেছিল সিনেমার মতো। তখনও কংগ্রেস সরকার চালাচ্ছে কেন্দ্রে।

আর গুরুজি নিজের ক্যারিশ্মায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ক্যাবিনেট মন্ত্রী। এও এক নজির। ভারতের প্রথম কোনও ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে শিবু সোরেন কে নিয়ে লুকোছাপার রোমহর্ষক পর্ব। ১৯৭৫ সালের ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে থাকা ২৩ জানুয়ারি জাতিগত গোষ্ঠী সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়েছিল তৎকালীন বিহারের চিরুডি গ্রাম (এখন ঝাড়খণ্ড)। দশ জনের মৃত্যু হয় সংঘর্ষে। নিহতদের বেশিরভাগ সংখ্যালঘু। ভারতের শিল্প ইতিহাসে বোকারোর নাম জ্বলজ্বল করছে।

এই শিল্প শহরকে ঘিরেই শিবু সোরেনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরপাক খেয়েছে। বিহারের রাজনীতি তো বটেই পরে ঝাড়খণ্ড তৈরির আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব, শিবু সোরেনের রাজনীতি বোকারো-দুমকা কেন্দ্রিক বললেও চলে। উপজাতি অধ্যুষিত বিহারের অংশটি আসলে খনি-শিল্প-বনভূমিতে ঘেরা। এমনই নবরত্ন এলাকাটিকে পৃথক রাজ্য করার দাবিতেই শিবু সোরেনের নেতৃত্বে জোরদার আন্দোলনে তৈরি হয় ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা-জেএমএম। শিবু সোরেনের সমসাময়িক বিহারের অন্যতম পুরোধা রাজনীতিক লালুপ্রসাদ যাদব বারবার এই রাজ্য ভাগের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু সফল হননি।

২০০০ সালে বিহার কেটে তৈরি হয় ঝাড়খণ্ড। রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথে শিবু সোরেন ও লালু প্রসাদ দুজনেই হয়েছেন দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনেও তাঁরা দুজনেই রয়েছেন ছায়া মানুষ হিসেবে। অথচ দুজনেরই প্রবল অদৃশ্য উপস্থিতি। পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি মামালায় রাঁচি সংশোধনাগারে বন্দি লালুপ্রসাদ-অসুস্থ এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক। আর দুমকা থেকে টানা সাংসদ হওয়া শিবু সোরেনও বয়সের ভারে ক্লান্ত। ঝাড়খণ্ডের রাজনীতিতে চালু কথা দুমকা কখনও খালি হাতে ফেরায়না গুরুজি-কে। সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনেও অশক্ত শরীর নিয়ে মাঠে ময়দানে নেমে পড়েছিলেন তিনি।

ফলাফল টেনে এনেছেন নিজের অনুকূলে। দেশজুড়ে মোদী হাওয়ায় কত রথী মহারথী কুপোকাত কিন্তু শিবু সোরেন জয়ী নিজের ক্যারিশ্মায়। জেএমএমের অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, পুত্র তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন লড়াই দিলেও কোনও এক অদৃশ্য জাদুবলে গুরুজি সবকিছু টেনে ধরে রেখেছেন। ঠিক যেমনটা করতেন তিনি ছোটবেলায় তাঁর গ্রামের বাড়ি রামগড়ের নেমরা গ্রামের বন বাদাড়ে অক্লেশে পাখি ধরার সময়। এ নাকি প্রকৃতির দেওয়া গুণ। এমনই মনে করে নেমরার বাসিন্দারা।

আদিবাসী সমাজ মানেই জঙ্গলময় জীবন। সেই সমাজের গুরু হয়েই প্রতিপত্তি শুরু শিবু সোরেনের। সেই কারণেই গুরুজি। নিজপক্ষ-প্রতিপক্ষ সবার কাছেই এই ক্যারিশ্মাটুকুই পুঁজি। প্রাকৃতিক সম্পদে ভারতের সবথেকে দামি রাজ্য, খনি-কারখানার বৃহত্তর কেন্দ্রের মালিক হয়েও ধুঁকতে থাকা উপজাতি রাজ্যের ভাগ্যে তেমন কিছুই জোটাতে পারেনা এই গুরুজির আশীর্বাদ