জোট অতীত৷ প্রচারে তৃণমূল৷ বহু টানাপোড়েনের পর প্রার্থী ঘোষণা করেছে কংগ্রেস৷ শুরু হয়েছে প্রচার৷ জোড়া ফুল বা পদ্ম ফুলের বিরোধীতা করে আদৌ কি দার্জিলিং কেন্দ্রে জয় পাবেন হাত শিবিরের শঙ্কর মালাকার? কতটা প্রস্তুত প্রার্থী নিজে? প্রচারের ফাঁকে কলকাতা 24×7-কে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন কংগ্রেস প্রার্থী শঙ্কর মালাকার৷ প্রশ্ন করলেন দেবযানী সরকার

কলকাতা 24×7: বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছেন কিন্তু এটা লোকসভার লড়াই… কতটা প্রস্তুত?
শঙ্কর মালাকার: আমি ৪০ বছর ধরে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত৷জীবনের অধিকাংশ সময়টাই আমি দলের জন্য ব্যয় করেছি৷ দল আমাকে অনেক সম্মান-মর্যাদা দিয়েছে৷ আমার নেতৃত্বে অন্তত এগারো-বারোটা নির্বাচন হয়েছে৷ তারমধ্যে লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত-সব নির্বাচন আমি করেছি৷ তাই লোকসভার লড়াইটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়৷

কলকাতা 24×7: নির্বাচনের ইস্যু কি?
শঙ্কর মালাকার: ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদী সরকার কোনও প্রতিশ্রুতি রাখেনি৷নোটবন্দি, জিএসটি, কালাধন, দু-কোটির চাকরি, রাফায়েল চুক্তি- কোনটাই ঠিকমতো পালন করা হয়নি৷ তারউপর ধর্মান্ধতার প্রচার শুরু হয়েছে৷ এসব মানুষ একদমই ভালভাবে নিচ্ছে না৷ এই পাঁচ বছরে অর্থনৈতিকভাবে দেশ অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছে৷ তাই আমাদের প্রচারটা খুব সহজ৷ মানুষের কাছে শুধু আমাদের ঠিকমতো পৌঁছতে হবে৷

কলকাতা 24×7: তাহলে এরাজ্যেও কি আপনাদের লড়াইটা শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে? তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলবেন না?
শঙ্কর মালাকার: আমাদের লড়াইটা তৃণমূলের সঙ্গে তো নিশ্চয়ই, তার থেকেও অনেক বেশি বিজেপির বিরুদ্ধে৷মোদীভাই- দিদিভাই দুজনেই দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ধ্বংস করছে৷ দুজন দুটো মুখোশ পরে রয়েছেন৷তাই দুজনকেই আমরা আলাদা চোখে দেখি না৷ দিদির এরাজ্যের বাইরে কোথায় জিতে আসার সম্ভবনা নেই৷ এখানেও ৩২ টা আসন পাবে কিনা সন্দেহ৷ দিদি যটা আসনই পান না কেন সেই আসন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না৷বিজেপির বিরুদ্ধে দেশের সর্বত্র আমরাই লড়ছি৷ তাই অন্যকে ভোট দিয়ে লাভ নেই৷ কংগ্রেসকে ভোট দিলে অপশাসন, ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া হবে৷

কলকাতা 24×7: বাম-কংগ্রেস জোট ভেস্তে যাওয়ায় কংগ্রেসের সুবিধে হল না অসুবিধে হল?
শঙ্কর মালাকার:কোনও অসুবিধেই হয়নি৷ যাঁরা অহংকার দেখিয়ে জোটটা ভাঙল, যাঁরা কংগ্রেসের সমর্থন ছাড়া কোচবিহার থেকে বালুরঘাট পর্যন্ত একটা আসনও পাবে না তারা ঠিক করবে আমরা কোন আসনে লড়ব, এভাবে মান-সম্মান বিকিয়ে দিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই জোট গড়া সম্ভব নয়৷ জোটটা না হওয়াতে এবং জোটের পিছনে ছুটতে গিয়ে যেভাবে দেড়-দু মাস আমাদের নষ্ট হল তাতে আমাদের অনেকটাই অসুবিধে হয়৷ এটা না হলে আমরা প্রচারে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারতাম৷ কিন্তু সেটা হল না৷ ফলে আমাদের বাড়তি পরিশ্রম হচ্ছে৷

কলকাতা 24×7: বলা হয়, পাহাড়ের রাজনীতিতে গোর্খারাই শেষ কথা বলে৷ গতবার গোর্খাদের একটা বড় অংশের সমর্থনেই বিজেপি দার্জিলিং কেন্দ্রে জিতেছিল৷ এবার সেই সমর্থনটা তৃণমূলের দিকে গিয়েছে৷ তার উপর এই কেন্দ্রে চতুর্মুখী লড়াই৷ কংগ্রেসের লড়াই এখানে কতটা চ্যালেঞ্জের?
শঙ্কর মালাকার: দার্জিলিংয়ে লড়াইটা অবশ্যই কঠিন৷ কার্শিয়াং, কালিম্পং, দার্জিলিং-পাহাড়ের তিনটি বিধানসভাই পাহাড়কে নিয়ন্ত্রন করে৷যে প্রত্যাশা নিয়ে পাহাড়ের মানুষ একত্রিত হয়ে ১০ বছর বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, যশোবন্ত সিনহা- সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিহাকে জিতিয়েছেন তাঁদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি৷ বিজেপিও তাঁদের অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল৷ কিন্তু কিছুই দেয়নি৷স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির বিরুদ্ধে পাহাড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়ে গিয়েছে৷এমনও হয়েছে সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিহাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে থানায় ডায়েরিও করা হয়৷

এবার গোর্খার টিকিটে জেতা বিধায়ক অমর সিং রাই লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থী৷ পাহাড়ের আগের অবস্থা এখন আর নেই৷ আগে সুভাষ ঘিসিং কিংবা বিমল গুরুং যা বলতেন তাই হত৷ এখন আর তা নেই৷ তাই একদিকেই সব ভোট পড়বে এমন হবে না৷ আমার কেন্দ্রে চারটে বিধানসভা রয়েছে৷ এই চারটে বিধানসভাতেই আমি ৪০ বছর জাতীয় কংগ্রেসের সৈনিক হিসেবে কাজ করেছি৷ এটা ঠিকই পাহাড়ে আমাদের সংগঠন দুর্বল৷ তবে আমি মনে করি, পরিশ্রম করতে পারলে, মানুষের কাছে ঠিকমতো পৌঁছতে পারলে তার একটা ফল ঠিক পাওয়া যাবেই৷

কলকাতা 24×7: গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সমর্থন পেয়ে এবার কি দার্জিলিংয়ে তৃণমূল বাড়তি সুবিধে পাবে?
শঙ্কর মালাকার: ওদের কাছে ম্যান-মানি-মাসল, তিনটে পাওয়ারই রয়েছে৷ তাছাড়া প্রশাসন-তোলাবাজ সব ওদের হাতের মুঠোয়৷ তো একটা বাড়তি সুবিধে তো রয়েইছে৷

কলকাতা 24×7: প্রচারে বেরিয়ে কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন?
শঙ্কর মালাকার: প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জন্য নির্বাচনে দাঁড়াইনি৷ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী থাকলে দেশকে ধ্বংস করবেন৷দেশের স্বার্থে আমরা মানুষের কাছে ভোট চাইছি৷ আর কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়াতে আমি বিশ্বাস করি না৷ যাঁরা ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেয় তাদের পুরোটাই ভাঁওতাবাজি৷ভোটের আগে লন্ডন বানিয়ে দেব, এই করে দেব, সেই করে দেব বলে আর ভোট মিটলেই পালায়৷ আমাদের দলের ম্যানিফেস্টোতে রয়েছে মোদীমুক্ত ভারত চাই ৷এবার মানুষ ঠিক করবে রাহুল গান্ধী না নরেন্দ্র মোদী কে প্রধানমন্ত্রী হবেন৷

কলকাতা 24×7: গোর্খাল্যান্ড পাহাড়বাসীর একটা বড় আবেগ৷গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পাশে থাকার কোনও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন?
শঙ্কর মালাকার: আলুওয়ালিয়া এখানে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ৷ ৩২৫টা সাংসদ নিয়ে যাঁরা দেশটাকে পাঁচবছর চালালো তাঁরা চাইলে পাহাড়ের আরও উন্নয়ন করতে পারত৷ রাজীব গান্ধী হিল কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের উন্নয়ন করতে চেয়েছিলেন৷ জ্যোতিবাবুরা সেটা ভেঙেছেন৷ মনমোহন সিং-চিদম্বরমরা জিটিএ তৈরি করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাকে ভাঙলেন৷কাজেই আবেগপ্রবণ কথা বলে মানুষকে বোকা বানানোর কোনও ইচ্ছে নেই৷ তবে আমরা জিতলে দার্জিলিংয়ের স্থায়ী সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেব৷ইতিমধ্যেই সেটা আমরা আমাদের হাইকম্যান্ডকে জানিয়েছি৷

কলকাতা 24×7: জেতার ব্যপারে কতটা আশাবাদী?
শঙ্কর মালাকার: এসইউসির মতো দলের প্রার্থীও তো জেতার ব্যাপারে আশাবাদী৷ আর আমি তো ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী৷যে দলটার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত-তিনটেই রয়েছে৷৪০ বছরের রাজনীতি করা কর্মী হয়ে আমি জেতার ব্যাপারে একশো শতাংশ আশাবাদী৷

কলকাতা 24×7: জিতলে সাংসদ হিসেবে দার্জিলিং কেন্দ্রের মানুষের জন্য প্রথম কোন কাজটা করতে চান?
শঙ্কর মালাকার: দার্জিলিংকে সাজিয়ে সত্যিকারের সুইৎজারল্যান্ড তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে৷ও সেটা কেন্দ্রীয় সরকারের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে৷ আমি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি৷ কিন্তু দার্জিলিংয়ের বিকল্প আমি কোথাও দেখিনি৷স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-এই দুটো বিষয়েই পাহাড়ের মানুষ অবহেলিত৷ঢপবাজি-প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাভ নেই৷ আমরা ক্ষমতা এলে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও এএইমসের ধাঁচে হাসপাতাল করব এবং পর্যটনকে আরও উন্নত করব৷