সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ছোট্ট ছেলেটি ছিল বিশ্বকবির ছায়া। তার হাতেই শুরু শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব। বিশ্বকবি তখন ধারেকাছেও ছিলেন না। নিজের ভাবনায় শান্তিনিকেতনে একার দায়িত্বে শুরু করে বন্তত উৎসব। অতি আদরের সে ছেলে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দোল উপলক্ষে রঙের উৎসবে মাতবে শান্তিনকেতন। কবি পুত্র ? শান্ত ছেলে হয়তো সে সব দেখবে কোনও এক শমী গাছের আড়াল থেকে।

১৮৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যা ছ’টায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেই শমীন্দ্রনাথের জন্ম। পাঁচ ছেলে মেয়ের সবার ছোট শমীন্দ্রনাথের চেহারা আর স্বভাবের মধ্যে নিজের শৈশবকে খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মজার ছলে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি ডাকতেন ‘শমী ঠাকুর’ বলে। মা মৃণালিনী দেবীর পিসি রাজলক্ষ্মী দেবীর কাছেই পড়াশোনা করতেন মাত্র ছয় বছর বয়সেই মাতৃহারা শমীন্দ্রনাথ। কিন্তু তার আসল শিক্ষা শুরু হয়েছিল শান্তিনিকেতনেই। শমীর সরল, শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল, শিষ্ট আচরণ সকলকে মুগ্ধ করত। রবি ঠাকুরের ছেলে হয়েও বিন্দুমাত্র বিলাসিতা অহংকার ছিল না তার ব্যবহারে চালচলনে। রবীন্দ্রনাথ শমী ঠাকুর সম্বন্ধে বলেছিলেন, “আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনত।”

সদাহাস্য ছেলের একটাই সমস্যা ছিল। বড়ই রুগ্ন ছিল সে। রবীন্দ্রনাথ ২৪ এপ্রিল ১৯০৭ একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “শমী ঠাকুর সেদিন লাইব্রেরির বই গোছাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাতে জ্বরে পড়েছে। জ্বরে পড়ে খুব গান ও কাব্যালোচনা করচে। আজকাল হঠাৎ তার গানের উৎসাহ অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে। প্রায়ই ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ গেয়ে বেড়াচ্ছে।’ প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, ”যাহাকে ঋতু উৎসব বলে, তাহার প্রবর্তক হইতেছেন রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথ। শ্রীপঞ্চমীর দিন তাহার উদ্যোগে এই ঋতু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শমীন্দ্রনাথ এবং আরও দুইজন দুইজন ছাত্র বসন্ত সাজে, একজন সাজে বর্ষা; আর তিনজন হয় শরৎ। শমীন্দ্রনাথ এই উৎসবে ‘ এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে’ গানটি করেন। শান্তিনিকেতনে ঋতু উৎসবের ইহাই প্রথম অর্ঘ্য।” সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ছিলেন না। তিরিশের দশকের প্রথম দিকে গুরুদেব শান্তিনিকেতনে ‘বসন্তোৎসব’ নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বার্ষিক ঋতুভিত্তিক উৎসবটির সূচনা করেন। কিন্তু তার অনেক আগেই তাঁর প্রাণের প্রিয় শমী চলে গিয়েছিল এই জগৎ ছেড়ে। অন্য কোনও প্রকৃতির লাবন্যে মেতে উঠতে।

রুগ্ন ছিল শমী, তাই খেলাধূলা করার সুযোগও পেত না। বিকেলে খেলার মাঠের পরিবর্তে যেত গ্রামের পথে। দাদা রথীন্দ্রনাথ কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য আমেরিকা যান। সেই সময় শমী তাঁর চিঠিতে আশ্রমের খবর দিত। লিখত, কোন গাছে কী ফুল ফুটেছে, কোথায় বেড়াতে যাচ্ছে তারা, ছাত্রদের সভায় সে কোন কবিতা আবৃত্তি করেছে এইসব নানাধরনের খবর।

১৯০৭ সালের কনিষ্ঠা কন্যা মীরার অসুস্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। রুগ্ন শমীকে কোথায় রাখবেন সেই চিন্তা তাঁকে আরও বেশি বিব্রত করে তুলেছিল। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক সুবোধচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে দিল্লী পাঠাবেন ভেবেও সরে আসেন। তখন সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ চলছিল। শেষে বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের শ্বশুরবাড়ি মুঙ্গেরে পাঠাবেন বলে তাঁকে চিঠি লিখে পাঠান। চিঠিতে কবি লিখেছিলেন, “শমী কোলকাতা পছন্দ করে না, সেখানে যেতেও চায় না অথচ ছুটিতে শান্তিনিকেতনে তাঁর একলা ঠেকে। শমী এত অল্প জায়গা জোড়ে এবং এত নিরুপদ্রব যে তার আগমনে তোমাদের মুঙ্গের সহরের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা নেই।’ ১৬ অক্টোবর বিজয়াদশমীর দিন শমীন্দ্রনাথ মুঙ্গেরে যায়। কিন্তু নিয়তি এমনই যে তৎকালীন রোগের প্রকোপহীন মুঙ্গেরেও কলেরায় আক্রান্ত হল শমীন্দ্রনাথ।

খবর পেয়েই ১৭ নভেম্বর কবি ডাক্তারসহ যান মুঙ্গেরে। সমস্ত চেষ্টা নিষ্ফল করে ৭ অগ্রহায়ণ ( ২৪ নভেম্বর) মাত্র এগারো বছর ন’মাস বয়সে রবি ঠাকুরের আদরের ‘শমী ঠাকুর’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। কাকতালীয় ভাবে ঠিক পাঁচ বছর আগে ৭ অগ্রহায়নেই মৃত্যু হয়েছিল তার মা মৃণালিনী দেবীর (রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী)।

রবীন্দ্রনাথ মেয়ে মীরাকে চিঠিতে লিখেছেন ‘‘শমী যে রাত্রে চলে গেল তার পরের রাতে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই৷ মন বললে কম পড়েনি, সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে৷ আমিও তার মধ্যে৷’ রচিত হল তাঁর অন্যতম অমর সৃষ্টি ,
‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে !
আজ জ্যোত্স্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ।
যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে,
এই নিরালায় রব আপন কোণে
যাব না এই মাতাল সমীরণে ।’

কবি পুত্র শোককে রূপান্তরিত করেন প্রকৃতি বন্দনায়। এই ঋতু উৎসব বাঙালির অন্যতম প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

পপ্রশ্ন অনেক: নবম পর্ব

Tree-bute: আমফানের তাণ্ডবের পর কলকাতা শহরে শতাধিক গাছ বাঁচাল যারা