ঘরের মাঠে স্বপ্নের টেস্ট অভিষেক৷ সর্বোচ্চ মঞ্চে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যতটুকু মানসিক প্রস্তুতি দরকার, সেটুকুও ছিল না৷ জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার উত্তেজনা সামলে ওঠার আগেই মাঠে নেমে পড়তে হয় শাহবাজ নদিমকে৷ তাও আবার কলকাতা থেকে রাঁচি পর্যন্ত সড়কপথে পাড়ি দেওয়ার ধকল সঙ্গে নিয়েই৷ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচেই দুরন্ত পারফর্ম্যান্স করার পরেও পরবর্তী বাংলাদেশ সিরিজের দল থেকে বাদ পড়তে হয় নদিমকে৷ যদিও তাতে বিন্দুমাত্র হতাশ নন ঝাড়খণ্ডের তারকা স্পিনার৷ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজের ভারতীয় দল ঘোষণা হওয়ার পর নিউ আলিপুরে নিজের ফ্ল্যাটে বসে কলকাতা ২৪x৭’এর ক্রীড়া সম্পাদক সুশান্ত মণ্ডল-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সদ্য টেস্ট ক্যাপ হাতে পাওয়া সদ্য টেস্ট অভিষেক হওয়া শাহবাজ নদিম

ঘরের মাঠে টেস্ট অভিষেকের অনুভূতিটা কেমন?

ঘরের মাঠে প্রথমবার জাতীয় দলে খেলার জন্য ডাক পেলে আলাদা অনুভূতি হয়৷ ঘরের মাঠে খেলতে চায় সবাই৷ সৌভাগ্যবশত আমি মাঠে নামারও সুযোগও পেয়ে যাই৷ ঘরের মাঠে, ঘরোয়া দর্শকদের সামনে জীবনের সব থেকে বড় ম্যাচ খেলার মতো ভালো বিষয় আর কিছুই হতে পারে না৷ আমার জীবনে এর থেকে ভালো কিছু আগে কখনও ঘটেনি৷

সব ক্রিকেটারের স্বপ্ন থাকে টেস্ট খেলা৷ ঘরের মাঠে সেই স্বপ্নপূরণ৷ দর্শকদের সমর্থন কতটা উদ্দীপ্ত করেছে?

নদিম: অনেক বন্ধুরা ছিল৷ অ্যাসোসিয়েশনের লোকেরা ছিল৷ আর দর্শকরা সারাক্ষণ সমর্থন করেছে৷ ঘরের মাঠে খেলার একটা ইতিবাচক দিক হল পারফরম্যান্স খারাপ হলেও টিপ্পনি শুনতে হয় না৷ সবাই ভালো খেলার জন্য উৎসাহিত করে৷

বিরাট কোহলির সঙ্গে আগে বহু ম্যাচ খেলেছ৷ ঘরোয়া ক্রিকেটে জাতীয় দলের প্রায় সবার সঙ্গেই মাঠে নামার অভিজ্ঞতা আছে৷ এক্ষেত্রে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার আগে কতটা নার্ভাস ছিলে?

নদিম: চাপে সবারই থাকে৷ তবে ড্রেসিংরুমে ঢোকার পর যেরকম পরিবেশ ছিল, ক্যাপ্টেন-কোচ যেভাবে চাপটা হালকা করে দিয়েছিল, আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি এটা আমার অভিষেক ম্যাচ৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার মাঠে নামার আগে সবারই নার্ভাসনেস থাকে৷ তবে দলের অন্দরমহলে পরিবেশটাই এমন ছিল যে, মনে হচ্ছিল আমি সবার সঙ্গে দীর্ঘদিন খেলে আসছি এবং আরও একটা ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলতে নামছি৷

ঠিক কোন সময়ে তোমার কাছে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবর আসে?

নদিম: শুক্রবার দুপুর ২টো নাগাদ আমি যখন নামাজ পড়ছিলাম, তখনই ফোন আসে৷ প্রথমে তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না৷ ভেবেছিলাম কারও ব্যাক-আপ হিসাবে ডাকা হচ্ছে৷ আসলে ব্যাক-আপ হিসাবেই ডাকা হয়েছিল৷ ভেবছিলাম দলের সঙ্গে থাকব ম্যাচের দিনগুলোয়৷ ম্যাচের দিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে কোচ জানায় তোমার অভিষেক হতে পারে৷ তোমাকে খেলানোর কথা ভাবছি আমরা৷ মানসিকভাবে প্রস্তুতি শুরু করে দিই তখনই৷ তবে যখন সড়ক পথে যাচ্ছিলাম, তখন কোথাও একটা মনে হচ্ছিল যে, এত কম সময়ের নোটিশে ডাকছে, খেলার সুযোগ মিলতেও পারে৷ রবি স্যার বলার পর নিশ্চিত হই যে মাঠে নামছি৷

সুযোগ পেলে কীভাবে নিজেকে মেলে ধরবে, এমন কিছু পরিকল্পনা করেছিলে রাঁচি যাওয়ার পথে?

নদিম: খুব বেশি তো ভাবার সময় পাইনি৷ এত বেশি ফোন কল আসছিল৷ তবে ওখানে গিয়ে ভাবতে শুরু করি৷ ঠিক করেছিলাম যে, ঘরোয়া ক্রিকেটে যেটা করে এসেছি এতদিন, ঠিক সেভাবেই বোলিং করব৷ তার বাইরে কিছু করতে গেলে সফল নাও হতে পারি৷ সেই মতোই আমি নিজের বেসিক জিনিসগুলোয় নজর দিয়েছি৷ প্রথমিক পরিকল্পনাগুলোকেই বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করেছি৷

টেস্ট ক্যাপ হাতে পাওয়ার মুহূর্তটা কেমন ছিল?

নদিম: টেস্ট ক্যাপ হাতে পাওয়ার জন্যই দেশের সব ক্রিকেটার মাঠে নামে৷ সবার স্বপ্ন থাকে দেশের হয়ে টেস্ট খেলার৷ সেই স্বপ্ন যখন সত্যি হয়, অনুভূতিটা সবসময় স্পেশাল হয়৷ একটা আবেগ কাজ করছিল৷ মনে হচ্ছিল এতদিনর সব পরিশ্রম স্বার্থক হল৷

প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে অত্যন্ত ধারাবহিক৷ আগে কখনও মনে হয়েছিল জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া উচিত?

নদিম: যেভাবে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছি, তাতে আমার সবসময় মনে হত জাতীয় দলে ডাক পেতেই পারি৷ আশাবাদী ছিলাম, কখনও না কখনও ডাক আসবে৷ ওটাই আমার প্রেরণা ছিল বছরের পর বছর ভালো খেলে যাওয়ার৷

অভিষেক ম্যাচে এত ভালো খেলা সত্ত্বেও কুলদীপ ফিট হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট দলে জায়গা হয়নি৷ তার জন্য কোনও দুঃখ বা হতাশা গ্রাস করছে না?

নদিম: না, তেমনটা নয়৷ যদি ভালো না খেলতে পারতাম এবং দল থেকে বাদ পড়তাম তাহলে দুঃখ হতো৷ বরং একটা আত্মতুষ্টি রয়েছে যে, যেটা আমি করতে পারি, প্রথম সুযোগেই সেটা করে দেখাতে পেরেছি৷ যত ওভার বল করার সুযোগ পেয়েছি, খারাপ বল করিনি৷ বাদ পড়লে সবার খারাপ লাগে৷ তবে একজন ক্রিকেটারের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, চোট-আঘাত সবার জীবনের অঙ্গ৷ চোটের জন্য কারও দল থেকে বাদ পড়া দূর্ভাগ্যজনক৷ চোট সারিয়ে দলে ফিরলে তারই প্রথমে সুযোগ পাওয়া উচিত৷

এই যে ভালো খেলেও পরের ম্যাচে সুযোগ এল না, এতে কী তোমার ভালো খেলার খিদে আরও বাড়বে?

নদিম: সেটা তো নিশ্চিত৷ একবার জাতীয় দলে খেলার স্বাদ পেলে পরে আবার সেই জায়গা ফিরে পেতে চায় সবাই৷ আমারও লক্ষ্য থাকবে সামনে যে কোনও ম্যাচেই ভালো পারফরম্যান্স করে আবার আন্তর্জতিক পর্যায়ে মাঠে নামার এবং যেটা ঘরোয়া ক্রিকেটে করি, সেটাই আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে করে দেখানোর৷

দলের কারও কাছ থেকে বিশেষ কোনও বার্তা পেয়েছিলে?

নদিম: বিরাট আমাকে টেস্ট ক্যাপ দিয়ে বলে, ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক পরিশ্রম করেছ৷ তার পরে এটা অর্জন করেছ তুমি৷ রবি স্যারও বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে কতটা পরিশ্রমের পর তুমি এটা হাতে পেয়েছ৷ তুমি জানো এটার মূল্য কতটা৷ বাকিদের থেকে কতটা আলাদা বলেই এই সুযোগ পেয়েছ৷

ম্যাচে শুধু উইকেট পাওয়াই নয়, ভালো বলও করেছ৷ এটা কী কোথাও বাড়তি তৃপ্তি দিচ্ছে তোমাকে?

নদিম: দলের সবাই প্রশংসা করেছে৷ সতীর্থরা ছাড়াও কোচ, বোলিং কোচ, সাপোর্ট স্টাফরা সবাই বলেছে ভালো বোলিং করেছ৷ বিরাট, রোহিতের মতো বড় বড় ক্রিকেটার, যাদের টিভিতে দেখে এসেছি, তারা সবাই যখন প্রশংসা করে, তখন ভালো লাগা স্বাভাবিক৷

ধোনির সঙ্গে বহু ম্যাচে মাঠে নেমেছ৷ ধোনির ক্যাপ্টেন্সি আর বিরাটোর ক্যাপ্টেন্সির মধ্যে কোনও তফাৎ চোখে পড়ল?

নদিম: মাহি ভাইয়ের সঙ্গে যতবার খেলেছি, কখনও ও ক্যাপ্টেন্সি করেনি৷ সাধারণ প্লেয়ার হিসাবে খেলেছে৷ তবে ওর ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে নতুন করে কী বলব৷ সেটা তো সারা বিশ্ব জানে৷ বিরাট যেভাবে ক্যাপ্টেন্সি করছে, বিশেষ করে নতুনদের যেভাবে আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে, সেটা অনবদ্য৷

ধোনি ম্যাচের শেষের ড্রেসিং রুমে তোমার সঙ্গে কথা বলেছে৷ কী কথা হয়েছিল দু’জনের মধ্যে?

নদিম: আমি জিজ্ঞাসা করছিলাম, আমার বোলিং দেখে কেমন লাগল৷ মাহি ভাই বলে, তুমি দারুণ বল করেছ৷ দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো বল করে আসছ৷ তোমার অভিজ্ঞতা রয়েছে৷ ঘরোয়া ক্রিকেটে যেটা কর, ঠিক সেটাই এই পর্যায়ে করে যেও৷ আলাদা কিছু করার দরকার নেই৷ এই ম্যাচে যেমন বল করেছ৷ পরে ঠিক এটাই করে যেও৷