স্টাফ রিপোর্টার, পুরুলিয়া: গ্রামে চুরি হয়েছে৷ গ্রামজুড়ে রে রে করে শুরু হল চোর ধরার পালা৷ ধরা পড়ল শবর সম্প্রদায়ের কেউ৷ কয়েক বছর আগেও এই ছবিই ছিল দস্তুর৷ গল্পের ছলে দাদু বলতেন ‘‘চোর মানেই শবর৷’’

তখন থেকেই কৌতুহলের সূত্রপাত৷ কেন এমন হবে? চুরি কি কেবল সবর সম্প্রদায়ের মানুষই করে৷ কেন করে এমন তারা? প্রশ্ন করতে করতেই শবরদের সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা শুরু৷ তৈরি হয় তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ৷

আরও পড়ুন: শ্রমিক ধর্মঘটে ফের সংকটে চা-শিল্প

মনে মনে সংকল্প করে নেওয়া চাকরি পেলেই সবরদের হাল ফেরাতে উদ্যোগী হতে হবে৷ বহু কষ্টের মধ্যে দিয়েই সরকারি চাকরি পেতেই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেওয়া শুরু পুরুলিয়ায় পারুই গ্রামের অরূপ মুখোপাধ্যায়ের৷

গ্রামের ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান অরূপবাবু৷ ফলে অঞ্চলে তাঁদের মান্যি করতো সবাই৷ স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা৷ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাদুর কথা ভাবাতো তাঁকে৷ শবরদের সঙ্গে মেলামেশা পর শিক্ষা, অনাহার ও অর্থাভাবই সবরদের দুর্দশার আসল কারণ৷ কলেজে পড়তে পড়তেই তাই অরূপবাবু সিদ্ধান্ত নেন পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র শবরদের জন্যও কিছু করতে হবে৷

আরও পড়ুন: জয়পুরে জীবিত ব্যক্তির শেষকৃত্য!

১৯৯৯ সালে কলকাতা পুলিশে চাকরি পান অরূপ মুখোপাধ্যায়৷ স্বপ্নের জাল বাস্তবে বুননের শুরু তখন থেকে৷ কিন্তু যা বেতন তাতে হবে না৷ কিন্তু অরূপবাবুতো নাছোড়৷ দশ বছর চাকরি করে জমালেন আড়াই লাখ টাকা৷ মায়ের কাছ থেকে ধার নিলেন পঞ্চাশ হাজার৷ তাতেও কুলোয় না৷ অগত্যা মায়ের শরীর খারাপের নাম করে ব্যাংক থেকে ধার নিলেন দেড় লাখ৷ সাড়ে চার লাখ দিয়ে শুরু যাত্রা৷

সালটা ২০১১৷ পথ চলা শুরু পুঞ্চা নবদিশা মডেল স্কুলের৷ শবর সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করে সমাজের মূল স্রোতে জায়গা করে দিতেই কলকাতা পুলিশের কর্মী অরূপ মুখোপাধ্যায় এই স্কুল তৈরি করেন৷ আবাসিক এই স্কুলের পড়ায়া সংখ্যা ১১২ জন৷ সম্পূর্ণ অবৈতনিক এই মডেল স্কুলের বেশিরভাগ পড়ুয়াই এসেছেন অত্যন্ত নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে৷ পেট ভরে খেয়ে পড়াশুনো যাদের কাছে স্বপ্নের মতো৷ কিন্তু অরূপবাবুর হাত ধরে সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবের জমিতে৷

আরও পড়ুন: অস্ত্র-সহ গ্রেফতার দুই দুষ্কৃতী

পুঞ্চা নবদিশা মডেল স্কুলের সরকারি অনুমোদন থাকলেও নেই কোনও সরকারি সাহায্য৷ তবে হাত বাড়িয়েছেন কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি৷ আপাতত অরূপবাবুর বেতন ও তাঁদের অর্থেই চলছে স্কুলটি৷ পুরুলিয়া জেলায় শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে এই মডেল স্কুল৷ এগিয়ে আসছেন পিছিয়ে থাকা শবর সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরাও৷

ভালো এই কাজের জন্য মিলেছে স্বীকৃতিও৷ সম্প্রতি রাজস্থানের উদয়পুর থেকে প্রকাশিত ‘স্কুল নিউজ ম্যাগাজিন’ থেকে অরূপ মুখোপাধ্যায়কে দেওয়া হয়েছে বিশেষ সম্মান৷ তিনি পেয়েছেন Teacher Warrior Award 2018.

আরও পড়ুন: জমা জলের দুর্ভোগ কাটাতে অবরোধে ঘুসুড়ির বাসিন্দারা

দেশ , বিদেশের অনেক প্রতিনিধি ওই অনুষ্ঠান উপস্থিত ছিলেন৷ অরূপবাবুর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বরুণ গান্ধী৷ এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এলাকার রাজপরিবারের লক্ষ রাজ সিং মেওয়ার৷

এর আগে কুর্ণিশ জানিয়েছেন অন্যান্য বহু সংস্থাও৷ গত বছর বেঙ্গালুরু থেকে দু’টি সংস্থার তরফ থেকে Best Social Work Award পেয়েছেন তিনি৷ সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে চান এই মানুষটি৷

অচলায়তন ভাঙছে৷ শিক্ষিত হচ্ছে শবর সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম৷ আর অন্ধকারে থাকা নয়, নেপথ্যের কারিগর অরূপ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষদের হাত ধরে এবার আলোকবৃত্তে সামিল হবে তারাও৷

আরও পড়ুন: টানা বৃষ্টিতে বানভাসি বাঁকুড়ায় বাড়ছে আতঙ্ক