সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই মুহূর্তে সমগ্র মানবজাতি করোনার ভাইরাসের। ভাইরাস নিয়ে ত্রস্ত দেশ বিদেশের বিজ্ঞানী থেকে নেতা মন্ত্রী আমলারা। খুশি ,স্বস্তি এই বিষয়গুলির নীল গ্রহের সবথেকে বুদ্ধিধর জীবকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। কেউই নিজেকে ‘সেফ আছি’ এই কথাটা ভরসা করে বলতে পারছেন না। কিন্তু সম্ভবত সবথেকে সুখী সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসিরা। তারা না জানে এই মহাভয় সম্পর্কে। তাদেরকেও সম্ভবত জানবে এই ভাইরাস, কারণ সারা বিশ্ব থেকে এখনও তারা নিজেদেরকে আলাদা করে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

‘পড়শি’ জারোয়ারাও যেটা করতে পারেনি, সেটা করে দেখিয়েছে সেন্টিনেল দ্বীপের আদিবাসিরা। সেন্টিনেল দ্বীপের সভ্য্য জগতের মানুষ ধারে কাছে এলেই ছুটে আসে বিষমাখা তির, বর্শা। যেমন হয়েছিল ২০১৮ সালে। এক আমেরিকাবাসী খুব সখ করে ধর্মপ্রচার করতে গিয়েছিলেন বিশ্ব থেকে নিজেদের সবথেকে আলাদা করে রাখা এই উপজাতিদের দ্বীপে। লাভের লাভ কিছু হয়নি। সেন্টিনেলিদের হাতে প্রাণ গিয়েছিল ওই মার্কিনের। তারপর থেকে কেউ আর ওই দ্বীপের আশেপাশে যায় না। যেখানে তথাকথিত মান হুঁশ যুক্তদের আনাগোনা নেই সেখানে এমন ভাইরাস কি পৌঁছানো সম্ভব? সেন্টিনেল দ্বীপ নিয়ে কথা বললেই সর্বপ্রথম নাম চলে আসে ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়ের নাম।

তিনি kolkata24x7-কে জানিয়েছেন , ‘ওঁদের কাছে করোনা ভাইরাস পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটা প্রায় অসম্ভব বলা যেতেই পারে। কারণ প্রথমত ওটা সুরক্ষিত অঞ্চল। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের বাইরে। কেউ যদি এখন লুকিয়ে চুরিয়ে ওঁদের কাছে যায় ওঁদের খাবার দেয় সে ক্ষেত্রে একটা সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু কে যাবে সেন্টিনেলিদের কাছে? তাও এখন। যেখানে সারা দেশে লকডাউন চলছে।’ তিনি আরও জানাচ্ছেন , ‘ওরা সভ্য জগতের মানুষ দেখলেই হামলা করে। সভ্য জগতের থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে। কেউ জোর করে গেলে সেটা আলাদা বিষয়, কিন্তু তাতেও ফল ভয়ঙ্কর হয়। তো বলা যেতেই পারে ওরা এই মুহূর্তে সবথেকে সুখী এবং সভ্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না রেখেই ওরা খুশি।’

১৯৯১ সালের ৪ জানুয়ারি মধুমালা চট্টোপাধ্যায় প্রথম সভ্য জগতের মানুষ যিনি আদি সেন্টিনেলি এবং সভ্য জগতের সুস্থ স্বাভাবিক যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়েছিলেন। দিল্লি থেকে তাঁর সেন্টিনেলি দ্বীপ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন তাঁর কথা। ১৮৮০ সালে এক বৃটিশ কমান্ডার সশস্ত্র সেনাদল নিয়ে ধরে নিয়ে এসেছিলেন চার শিশুসহ এক সেন্টিনেলী দম্পতিকে। শিশুরা বাঁচলেও সভ্যতার ‘বিষ’ সহ্য করতে পারেনি ওই দম্পতি। তারা মারা যাবার পর শিশুদের আবার দ্বীপে ছেড়ে আসা হয়।

১৯৭০ সালে ASI এর বিশেষজ্ঞরা একবার চেষ্টা করেন উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে নামার, কিন্ত কূল থেকে ছুটে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে তীর তাদের সে আশায় জল ঢেলে দিয়েছিল । ১৯৭৪ এ ন্যাট জিও ‘Man in Search of Man’ নামে একটা ডকুমেন্টরী বানানোর উদ্দেশ্য নিয়ে নেমেছিলেন ওখানে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে পরিচালকের উরুতে আট ফুট লম্বা একটা বর্শা গেঁথে যেতে আর কারও সাহস হয়নি শ্যুটিং করার। সম্ভব করেছিলেন মধুমালা চট্টোপাধ্যায়। ওঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

প্রসঙ্গত আন্দামানেও করোনা হানা দিয়েছে। কিন্তু ‘দূর দূর তক’ সভ্যদের সংস্পর্শের বাইরে গ্রেট আন্দামানের উত্তর সেন্টিনেলী দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা। বহিরাগতদের ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্য তারা বিশেষভাবে পরিচিত। সেন্টিনেলি জাতি মূলত একটি শিকারী-নির্ভর জাতি। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ শিকার, মাছ ধরা, এবং বন্য লতাপাতার মাধ্যমে সংগ্রহ করে। এখন পর্যন্ত তাদের মাঝে কৃষিকাজ করা বা আগুন ব্যবহারে প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমন আদিমদের কাছে সভ্য মানব সমাজকে ত্রস্ত করে দেওয়া ভাইরাসের পৌঁছে যাওয়া কার্যত সম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি ব্রাজিলের স্বাস্থ্যমন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে, আমাজনের গভীরে বসবাসকারী কোকামা উপজাতির ২০ বছরের এক যুবতীর শরীরে এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। ব্রাজিল-কলম্বিয়া সীমান্তের খুব কাছে স্যান্টো আন্তোনিও দো ইকা জেলায় ওই আদিবাসী গ্রামটি অবস্থিত। ওই গোষ্ঠীতে প্রায় ৩০,০০০ লোকের বাস। সেই দ্বীপে মানুষের ভালোরকম সভ্যদের যাতায়াত রয়েছে। কেনিয়ার মাসাই উপজাতিরা তো এখন রীতিমত উন্নত। শুধু বেশভুষাটুকুই যা আদি রয়েছে। সেখানেই সম্ভাব্য ‘জয়’ সেন্টিনেলি দ্বীপের মানুষদের।