ফাইল ছবি

সুমন ভট্টাচার্য: দমদম হোক কিংবা কামারহাটি, আসলে পুরোটাই রঙ্গমঞ্চ। একজন ঘোষিত ভাবে নাট্যকার, পরবর্তীকালে রাজনীতিতে এসেছেন। আরেকজন পুরোপুরি রাজনীতিক, কিন্তু যে কোনও সেলিব্রিটিকে বলে বলে গোল দিতে পারেন ‘সিচ্যুয়েশন’ তৈরির দক্ষতায়। প্রথমজন যদি ব্রাত্য বসু হন, তাহলে দ্বিতীয়জনের নাম মদন মিত্র। মদন মিত্রের মতো আর কোনও রাজনীতিক ফেসবুকে লাইভ করে কিংবা বিভিন্ন ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে, এমন কি মিম-এর বিষয় হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যত আলোড়ন তৈরি করেছেন, এমনটা বোধহয় বলা যাবে না। এমনকি তিনি, মানে মদনদা যখন টেলিভিশন চ্যানেলের বিতর্কে প্রাক্তন সহকর্মী এবং বর্তমানের বৈরী অর্জুন সিংহের সঙ্গে ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধে’ জড়ান, তখনও মনে হয় টলিউডের কে সলিল তো দূরের কথা, বলিউডের সিনেমাও হার মেনে যাবে। আসলে মদনদা মানেই খবর, রঙিন বিতর্ক এবং বিকেলের চায়ের সঙ্গে মুচমুচে গসিপ। এই বারের প্রার্থীপদ ঘোষণা হওয়ার পরেও তিনি যখন একটি সর্বভারতীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠানে গঙ্গাবক্ষে গেরুয়া শিবিরের তিন নায়িকা, শ্রাবন্তী, পায়েল এবং তনুশ্রীর সঙ্গে ‘খেলা হবে’ গাইলেন এবং নাচলেন, তখনও কি তুমুল আলোড়ন।

পঞ্চম দফার নির্বাচনে তাই যে-দুটি কেন্দ্রে লড়াই, সেখানে নাটকীয়তার কোনও অভাব নেই। ‘ঘরশত্রু’ বিভীষণদের সামাল দিয়ে দমদমের কঠিন পিচে বিজেপির দলবদলু তাত্ত্বিক নেতা বিমলশঙ্কর নন্দ-র চ্যালেঞ্জকে কীভাবে ব্রাত্য বসু সামাল দেন, সেই দিকে সকলে তাকিয়ে রয়েছেন। ব্রাত্য আদতে নাটকের লোক হলেও ফুটবল এবং ক্রিকেটকে খুবই ভালোবাসেন। যতটা মন দিয়ে তিনি ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখেন, প্রায় ততটাই খবর রাখেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের। দমদমের উদ্বাস্তু ভোটে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণই যে বিজেপির প্রধান ভরসা এবং তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে সিঁধ কাটতে যে তাঁরই প্রাক্তন সহযোগিদের মুকুল রায়ের মতো ভোট ম্যানেজাররা নিয়মিত ফোন করে চলেছেন, সেটা ব্রাত্য জানেন। কিন্তু এই ধরনের বিষাক্ত পিচে, যেখানে যে কোনও বলই শেন ওয়ার্নের গুগলি হয়ে যেতে পারে, সেখানে কীভাবে ব্যাট ধরে রাখতে হবে, তা গাভাসকারের অনুগামী ব্রাত্য সম্যক জানেন। আর সেই কারণেই তিনি শুধু তারকা প্রচারক জয়া ভাদুরীর রোড শো-এর উপর ভরসা করে নিশ্চিন্তে বসে ছিলেন না, তৃণমূলের আসল ‘গাণ্ডীব’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও শেষ মুহূর্তে এনেছিলেন দমদমে পদ্মফুলকে ঠেকাতে।

দমদমের লড়াইতে ব্রাত্য যদি নিজের বুদ্ধিজীবীর সত্ত্বার সঙ্গে ‘তারকা-ভ্যালু’-কে যোগ করে থাকেন, তাহলে কামারহাটিতে মদন মিত্র মানে শুধুই চমক। নিজের পরিচিত পিচে ২০১৬ সালে তিনি হেরে গিয়েছিলেন সিপিএম-কংগ্রেসের জোট প্রার্থী মানস মুখোপাধ্যায়ের কাছে। এবারের লড়াইতে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীর তুলনায় নবীনতর, সিপিএমের পরবর্তী প্রজন্ম সায়নদীপ। মদন-সায়নদীপের লড়াইতে বিজেপির বাজি কামারহাটির ছেলে এবং যাঁর সঙ্গেও ফুটবলের যোগাযোগ রয়েছে, সেই দলের পরিচিত মুখ রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বিজেপির যেকোনও বিক্ষোভ, আন্দোলন বা রাস্তায় নেমে মিছিলে প্রথমেই আহত হয়ে যান এবং তারপরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে তাঁর ছবিই ভাইরাল হয়। তাই কামারহাটির লড়াইতেও এবার নাটকীয়তা কিংবা ক্লাইম্যাক্স তৈরির কোনও কমতি নেই।

দমদম কেন্দ্রে ব্রাত্যকে যদি হিসেব রাখতে হয় সিপিএমের পলাশ দাস কতটা ভোট পাচ্ছেন, কারণ তাহলে মমতা-বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে বিমলশঙ্কর নন্দর জন্য কাজটা কঠিন হয়ে যাবে, তবে কামারহাটির ক্ষেত্রেও অঙ্কটা একইরকম। ২০১৬-র নির্বাচনে তৃণমূল-বিরোধী পুরো ভোটটাই যেহেতু সিপিএমের অভিজ্ঞ নেতা মানস মুখোপাধ্যায় টেনে নিতে পেরেছিলেন, তাই মদন মিত্রর আর বিধানসভায় যাওয়া হয়নি। এবার সায়নদীপ আর রাজু, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ভোট কার ঝুলিতে কতটুকু যাবে, তার উপরই নির্ভর করছে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী, প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রীর ভাগ্য কোন দিকে গড়াবে। ফুটবল হোক কিংবা গাড়ির চাকা, দুটোই তো না গড়ালে মুশকিল।
এবারের নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনার বেশ কয়েকটি আসনে সংযুক্ত মোর্চা কতটা ভোট পাচ্ছে, তাই নিয়ে অনেক বিধানসভার কেন্দ্রের সমীকরণ বদলে যাবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে ২০১৯-এ এই বঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির যে চমকপ্রদ উত্থান হয়েছিল, তার অনেকটাই ছিল বামেদের ভোট ‘রাম’-এ যাওয়ার কারণে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মূল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে বাম ভোটারদের বড় অংশ যে-কোনও মূল্যে তৃণমূলকে সরাতে চেয়েছিল, তা বিজেপির আচমকা ২৩ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি থেকেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল। এই নিয়ে পরবর্তীকালে রাজনীতিতে কম তর্ক-বিতর্ক হয়নি এবং বামেদেরও কম সমালোচনা সহ্য করতে হয়নি। এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেই বামেরা কংগ্রেস এবং আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে জোট বেঁধে ভোটের ময়দানে। বামেরা যদি নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ভোটব্যাঙ্কে কিছুটা অংশও পুনরুদ্ধার করে, তাহলে রামেদের ভাঁড়ারে টান পড়বে।

দমদম-কামারহাটির মতো উত্তর ২৪ পরগনার অনেক কেন্দ্রেই সেক্ষেত্রে নির্বাচনের সমীকরণ বদলে যেতেও পারে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.