সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: ‘Back to Basics’। সব কিছু ঘেঁটে গেলে নতুন করে শুরু করতে হয়। তেমনই এই স্কুল। বিশ্ব যখন ভুলতে বসেছে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা। তখনই ওই স্কুল যেন অক্সিজেন সংরক্ষণের কারখানা। গেলেই মিলবে প্রচুর শুদ্ধ অক্সিজেন।

সবুজের মাঝে শিক্ষাঙ্গন। ইট কাঠ দিয়ে তৈরি ভবন তৈরি করছে আগামী প্রজন্মকে। কিন্তু বিষবায়ুতে ভরতি এই পৃথিবীতে আগামী প্রজন্ম কতটা সুরক্ষিত। সবুজ ধ্বংস করতে করতে নীল গ্রহ ক্রমে বসবাসের অযোগ্য হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। এমন এক সময়ে গ্রামীণ হাওড়ার নাওদা নয়নচন্দ্র বিদ্যাপীঠ একটু অন্য পথে হাঁটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছে। সবুজে ভরতি স্কুলে দিচ্ছে প্রাণের আশ্বাস।

নীলসাদা বিল্ডিংগুলি যেন একটুকরো শান্তির নীড়,আর তার মধ্যে প্রাণের স্ফুরণ ঘটাচ্ছে নবপ্রজন্মের তরতাজা প্রাণ।এযেন শান্তিনিকেতনের ক্ষুদ্র সংস্করণ। শিক্ষাঙ্গন হোক মুক্তাঙ্গন। শিক্ষার সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত স্বাস্থ্য। তাই শিক্ষাঙ্গনে স্বাস্থ্যকর সবুজ নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক।আর সেই ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েই বিদ্যালয়কে পড়ুয়াদের কাছে মুক্তাঙ্গন রূপে গড়ে তুলতে একগুচ্ছ অভিনব ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে শ্যামপুর-২ ব্লকের নাওদা নয়নচন্দ্র বিদ্যাপীঠ।

বিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করার সময়ই অদ্ভুত সুন্দর ভালোলাগা তৈরি হয়ে যাবে। বিদ্যালয়ের পারিপার্শ্বিক নীরব সবুজ পরিবেশে মুহুর্তের মধ্যেই যে কেউ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রেমে পরবে তা নির্দ্বিধায় বলাই যায়।না, শুধু বিদ্যালয় চত্বর জুড়ে অনন্যসুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলাই নয়,সমানতালে বিভিন্ন সৃজনশীল ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে বিদ্যালয় চত্বরজুড়ে।জল সংরক্ষণের ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বৃষ্টির জল পুনর্ব্যবহারের বিশেষ ব্যবস্থা। পাশাপাশি,২-৩ ফুট গর্ত করে সেখানে সোকপিট করে তৈরি হয়েছে ভৌমজল সঞ্চয়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা।পড়ুয়াদের জল সচেতনতা সম্পর্কে শুভবার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এহেন উদ্যোগ বলে জানান বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষিকা সুচন্দ্রিমা সেনগুপ্ত।

একাদশ শ্রেণীর পড়ুয়ারাই নিজেহাতে সমস্ত কাজকর্ম করেছে বলে সুচন্দ্রিমাদেবী জানান।বিদ্যালয় চত্বরের মধ্যেই খনন করা হয়েছে ৪ ফুট গভীরতার ছোটো কৃত্রিম পুকুর।অর্ক,সচেতন,টিঙ্করের মতো ছাত্ররা সে পুকুরে ছেড়েছে ব্যাঙাচি,ছোটো মাছ।মূলত,পুকুরের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের হাতেকলমে পাঠ দিতেই এই অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।এরসাথে প্লাস্টিকের পুর্নব্যবহার সম্পর্কে পড়ুয়াদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাড়িতে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ বোটল ব্রিকস।তারমধ্যে গাছ বসিয়ে বিদ্যালয় চত্বরে সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে বলে জানান বিদ্যালয়ের শিক্ষক অমিয় সরকার।বিদ্যালয় জুড়ে সারি দিয়ে শোভাবর্ধন করছে কয়েকশো টবে থাকা বিভিন্ন ধরনের গাছ।

কিচেন গার্ডেনে চাষ হচ্ছে বেগুন,শাক,ঢ্যাঁড়স,লঙ্কাসহ বিভিন্ন সব্জি।সেইসমস্ত তাজা সব্জি মিড-ডে-মিলের রান্না কাজে ব্যবহৃত হয়।স্কুলের দেওয়াল জুড়ে বিভিন্ন সামাজিক বার্তা কিমবা কোথাও মনীষীর ছবি আবার কোথাও বা ভারতমাতার বীর যোদ্ধাদের বীরত্বের চিত্র,আবার বা সিঁড়িজুড়ে স্থান পেয়েছে জীবনে সাফল্যের পথে এগিয়ে চলার প্রেরণামূলক বার্তা।ক্যাম্পাস জুড়ে রয়েছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা।পড়ুয়াদেরও নিয়মিত ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সম্পর্কে সচেতন করা হয়।শুধু বিদ্যালয় চত্বরকে সাজিয়ে তোলাই নয়,পড়াশোনার সার্বিক মানোন্নয়ন,সুস্বাস্থ্য গড়ে তোলা,ছাত্রীদের আত্মরক্ষার পাঠ প্রদানের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে গ্রামীণ হাওড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।পড়ুয়ারা যাতে অভাব-অভিযোগ,সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে তার জন্য রয়েছে ‘মনের কথা’ নামক বিশেষ বাক্স। বাক্সে পড়ুয়ারা নিজেদের কথা লিখিতভাবে জমা দেয়।

বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুপ্রীতি দাসের তত্ত্বাবধানে ‘বিশাখা কমিটি’ পড়ুয়াদের অভাব অভিযোগ,সমস্যা খতিয়ে দেখে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে।এর পাশাপাশি অবস্থান করছে গল্প,রেফারেন্স,ক্যুইজ,জীবনীগ্রন্থে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।সাথী সানা,সাথী বেরার মতো পড়ুয়ারাই দায়িত্ব নিয়ে গ্রন্থাগারকে সাজিয়ে তুলেছে।বিদ্যালয়ে রয়েছে স্থায়ী প্রদর্শনীকক্ষ।পড়ুয়ারা নিজেরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শনীকক্ষে জমা দেয়।পায়েল,রূপসা,সুপর্ণাদের মতো কয়েকশো ছাত্রীকে আত্মরক্ষার জন্য নিয়মিত ক্যারাটের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।আবার,ছাত্রদের জন্য ব্যান্ড ও যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানান শিক্ষিকা মৌমিতা চ্যাটার্জী।বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হয় ক্রীড়া পত্রিকা।বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরুণাভ বাজানির কথায়,বিদ্যালয় মানে কেবল পুঁথিগত শিক্ষাপ্রদান নয়,একটি পরিপূর্ণ মানুষ গড়ার পীঠস্থান।

তাই বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পড়ুয়াদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিকাশের লক্ষ্যে জেলা সর্বশিক্ষা মিশনের প্রেরণাতে তাঁরা এহেন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।বিদ্যালয়ের এই ধরনের বহুমুখী কার্যক্রমে মুগ্ধ হয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় মানুষ থেকে প্রাক্তনীরা।সকলের সহযোগিতাকে পাথেয় করে মূলত একাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী,শিশু সংসদের সদস্য ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এধরনের ভাবনাকে রূপায়িত করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের বহু পড়ুয়া ইতিমধ্যেই নাওদা গ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতে শুরু করেছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।এহেন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছরই মিলেছে ‘নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার’।

শিশুমিত্রের দৌড়ে থাকা এই বিদ্যালয়ে সম্প্রতি রাজ্যস্তরের প্রতিনিধিরা পরিদর্শনে আসেন।শিশু সংসদের প্রধানমন্ত্রী অঙ্কিতা দাসের কথায়,এই ধরনের প্রাঞ্জল পরিবেশ তাদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। বিদ্যালয় পরিদর্শক অমিত দাস বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়াদেরর উদ্যোমী মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন , ‘পড়ুয়া থেকে শিক্ষকমহল,অভিভাবক,স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এভাবেই রাজ্যের দ্বারে এক মডেল স্কুল হিসাবে গড়ে উঠুক নাওদা নয়নচন্দ্র বিদ্যাপীঠ’।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও