বাঙালিজীবনে মূল্যবোধের সংজ্ঞাটাও বোধহয় ইদানীং পাল্টে যাচ্ছে৷সম্প্রতি  বাঙালির একাংশের আলোচনার বিষয় দেখে মনে হচ্ছে  ঘুষ দেওয়া-নেওয়া জীবনের অঙ্গ, এই লেনদেনের মধ্যেকোনও অপরাধবোধ নেই৷ আখের গোছাতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদী সত্তাটা হারিয়ে যাচ্ছে ৷এই পরিস্থিততে  সত্যজিৎ রায়ের কিছু ছবির কথা মনে পড়ছে। যা আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে৷

সত্যজিতের প্রথম দিকের ছবিগুলির মধ্য অন্যতম ছিল মহানগর৷  গত শতাব্দীর ষাটের দশকে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প নিয়ে তাঁর পরিচালিত এই ছবিটিতে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই প্রতিবাদ উঠে আসতে দেখা যায়৷ স্বামী সুব্রতর (অনিল চট্টোপাধ্যায়) পাশাপাশি স্ত্রী আরতি (মাধবী মুখোপাধ্যায়)সংসারের দায় ঘাড়ে তুলে নিয়ে সেলস গার্লের চাকরি নেয় ৷ কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তা নিয়ে চাপা অশান্তি, নানা জনের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এই দম্পতিকে৷ satyjit3পরিস্থিতির চাপে সেই চাকরি ছাড়বার কথা যখন ভাবা হয় তখনই সুব্রতর ব্যাংকে তালা পড়ে৷ সময়টা ব্যাংক জাতীয়তাকরণের আগের যুগ, ফলে সেই গৃহবধূর পক্ষে  আর চাকরি ছাড়া শেষ অব্দি সম্ভব হয়নি৷ ওই মুহূর্তে অর্থনৈতিক চাপের কাছে  সামাজিক চাপ মাথা নোয়ায়৷ কিন্তু এর কিছুদিন পরে চাকরি করতে করতেই মহিলার নজরে আসে তারই এক সহকর্মীকে অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে৷ তখনই সে প্রতিবাদ করে৷ সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী হয়েও সেই নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির গৃহবধূটিনিজের ভবিষ্যত অনিশ্চিত জেনেও চাকরি ছাড়ার সাহস দেখিয়েছিল৷ ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছিল ৫০-৬০ দশকে বাঙালির মূল্যবোধঅর্থনৈতিক চাপকে প্রতিহত করে শিরদাঁড়া সোজা রাখতে সক্ষম৷

মহানগরের এক যুগ বাদে  সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তি পেয়েছিল শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ছবি জনঅরণ্য৷ সত্তরের প্রথমদিক–  রাজ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা, পরীক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে৷সেই সময়ের মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে সোমনাথ (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়) পরীক্ষার ফল আশানিরুপ হয়নি৷ চাকরির চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ ৷বেঁচে থাকতে ব্যবসা করার কথা ভাবে৷ আর ব্যবসায় বরাত পেতে গিয়ে ঘুষের কার্যকারিতা বুঝতে পারে৷ ফলেদ্বিধা থাকলেও সেই মূল্যবোধ নৈতিকতার সঙ্গে আপোস করেও ঘুষ দিতে বাধ্য হয় ওই যুবকটি৷  বড় একটা কন্ট্রাক পাওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তিকে খুশি করতে তার ঘরে মহিলা পাঠাতেও সে শেষমেশ রাজি হয়৷ অর্থনৈতিক চাপ বাঙালির মূল্যবোধ নৈতিকতাকে প্রতিহত করে চলে যায়৷

সত্যজিত রায়ের একেবারে শেষ পর্বের ছবি হল শাখাপ্রশাখা৷

জনঅরণ্যের আরও বছর ১৫ পরে মুক্তি পেয়েছিল৷যাতে বাঙালি জীবনের অবক্ষয় নিয়ে এই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালকের উদ্বেগই ফুটে উঠেছিল৷ছবিতে আনন্দ মজুমদার (অজিতবন্দ্যোপাধ্যায়) একজন সৎ প্রতিষ্ঠিত শিল্পকর্তা৷তাঁর চার ছেলে প্রবোধ (হারাধনবন্দ্যোপাধ্যায়), প্রশান্ত ( সৌমিত্রচট্টোপাধ্যায় ), প্রবীর(দীপঙ্করদে) ওপ্রতাপ(রঞ্জিতমল্লিক) ৷প্রশান্ত অসুস্থ কোনও কাজ করেনা বাবার কাছেই থাকেন৷প্রবোধ চাকরিজীবি এবং প্রবীর ব্যবসা করেন৷এদের বাবা একজন পুরোদস্তুর সৎ মানুষ হলেও এই দুই ভাই কেউ সৎ নন৷উভয়েরই আয়ের উৎস নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে, রয়েছে দুর্নীতি৷satyjit2সৎ বৃদ্ধটি ছেলেদের এই অধঃপতনের কথা জানতে পেরে মানসিকভাবে আঘাত পান৷তবেএটাওঠিক, গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরুতে নির্মিত ওই ছবিতে আশার আলো ছিল আনন্দবাবুর ছোট ছেলে প্রতাপ চরিত্রটি, যিনি তার কাজের পরিবেশের দুর্নীতির সঙ্গে আপোস না করেই লোভনীয় চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারেন৷

২৪ বছর আগে ১৯৯২ সালে মারা যান সত্যজিৎ রায়৷জানিনা যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তবে বর্তমান রাজ্যের মানুষের আচরণ দেখে কোনও ছবি করার কথা ভাবতেন কিনা৷রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নানাভাবেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷সারদা কেলেঙ্কারি মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা নয়ছয় করা যেমন রয়েছে তেমনই অভিযোগ উঠেছে নারদা স্টিংকাণ্ডে শাসকদলের বেশ কিছু নেতা ঘুষ নিচ্ছেন৷কোনও কিছু নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাজানো ঘটনা, ছোট্ট ছেলেদের দুষ্টু ছেলেদের কান্ড বলে অসামাজিক অনৈতিক কাজগুলিকে প্রশয় দিয়েছেন৷ক্ষমতায় থাকার জন্য কোনও রাজনৈতিকদলের এহেন আচরণ মেনে নিলেও অবাক করে রাজ্যের বহু মানুষের কথাবার্তায়৷বিশেষত ইদানীং বেশ কিছু মানুষের কথাবার্তা আলোচনা দেখে মনে হয়েছে বাঙালি জীবনে ঘুষ দেওয়া নেওয়াটা আদৌ কোনও অপরাধ নয়৷এগুলি যেন একেবারে বাঙালির জীবনযাত্রা অংশবিশেষ অর্থাৎ এনিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করার কোনও মানে হয়না৷যদিও এর বিরুদ্ধমতও আছে৷তবে জানা নেই কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷

মহানগর ছবির শেষে আরতির প্রতিবাদে খুশি না হলেও নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন ওর স্বামী সুব্রত৷জন অরণ্য ছবির শেষে বাঁকা পথে কাজের বরাত পেলেও যেন অপরাধবোধে ক্লান্ত এক সোমনাথকে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল৷আর শাখাপ্রশাখা ছবিতে দুইভাই প্রবোধএবং প্রবীর অসৎ হলেও ছোটভাই প্রতাপের প্রতিবাদী আচরণকে তারিফ না করে পারা যায় না৷যা দেখে মনে হয় যারা নিজেরা জীবনে আপোস করছেন তারাও অপরাধবোধে ভোগেনএবং মূল্যবোধকে নৈতিক সমর্থন করেন ৷

শাখাপ্রশাখা ছবিমুক্তির পরে সিকিশতাব্দী সময় পেরিয়ে গিয়েছে৷প্রশ্ন, বাঙালির মূল্যবোধ ওঠানামা করে এখন কোন অবস্থায়? সত্যিই কি বড্ড অবক্ষয় হয়ে গিয়েছে নাকি চাটুকার স্তাবকদের আচরণ যাই হোক না কেন সুপ্তভাবে মূল্যবোধ নৈতিকতা বঙ্গজীবনে এখনও রয়ে গিয়েছে!