বিশ্বজিৎ ঘোষ

কলকাতা থেকে গা ঢাকা দেওয়ার পরে সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের গতিবিধির বিষয়ে কি ওয়াকিবহাল ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ? এই বিষয়টি সেভাবে প্রকাশ্যে না এলেও, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে৷ কিন্তু, কেন?

কারণ, কাশ্মীরের সোনমার্গ থেকে তখনও গ্রেফতার করা হয়নি সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনকে৷ তবে, সারদা চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে চলে আসায়, ওই গোষ্ঠী পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অংশ তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ এবং, ওই সব সংবাদমাধ্যমের কোনও কোনও অংশকে তখন চালু রাখার চেষ্টা চলছে৷ সেই প্রচেষ্টায় অন্যতম ভূমিকায় ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়৷ সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত একটি সংবাদপত্রের তরফে কয়েকজন প্রতিনিধিকে তখন নিয়মিত যেতে হত তৃণমূল কংগ্রেস ভবনে৷ সেখানে মুকুল রায় থাকতেন৷ ওই প্রতিনিধিরা সেখানে যেতেন৷ কেননা, তার অন্যতম কারণ প্রত্যাশা৷ এবং সেই প্রত্যাশা, যদি ওই সংবাদপত্র চালু রাখা সম্ভব হয়৷

আরও পড়ুন: সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

কারণ, এমনীতেই ওই সংবাদপত্রের সাংবাদিক, অসাংবাদিক কর্মীরা তখন ২০১৩-র ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বেতন পাননি৷ তার উপর, ওই সংবাদপত্র যদি চালু না থাকে, তা হলে, সকলেই তখন কর্মহীন হয়ে পড়বেন৷ এই কারণে তখন তৃণমূল কংগ্রেস ভবনে যেতেন ওই প্রতিনিধিরা৷ সেই সময় একদিন এমন একটি বিষয় জানা গিয়েছিল, সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেন তখন উত্তরাখণ্ডের কোন হোটেলে রয়েছেন এবং তার সঙ্গে কে রয়েছেন (একজন মহিলা), সেই খবর ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ স্তরের নেতৃত্বের একাংশের কাছে৷ যদিও, এই বিষয়টি কোনও দিন আদৌ স্পষ্ট হবে কি না, তা হয়তো সময় বলবে৷ তবে, স্বাভাবিক ভাবেই এমন প্রশ্নও কি উঠতে পারে না, ২০১৩-র ২৩ এপ্রিল কাশ্মীরের সোনমার্গের একটি হোটেল থেকে সুদীপ্ত সেনকে গ্রেফতারের আগে, সারদাকর্তার গতিবিধির বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ? সারদাকর্তার সঙ্গে তখন গ্রেফতার হয়েছিলেন দেবযানী মুখোপাধ্যায় এবং অরবিন্দ সিং চৌহান৷

মদন বনাম মদন এবং মিত্র

তেমনই, এমন প্রশ্নও আবার উঠবে না তাও কীভাবে সম্ভব যে, সারদাকাণ্ডে প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রই কি অন্যতম অভিযুক্ত? তিনি নির্দোষ কি না, অথবা, এই বিষয়টিও আদৌ কোনও দিন স্পষ্ট হবে কি না, তা হয়তো সময়-ই বলবে৷ তবে, প্রায় ১১ মাস পরে শর্তাধীন জামিনের পরের দিন বাড়ি ফেরার সময় মদন মিত্র যেভাবে ম্যাচ জেতার কথা জানিয়ে সত্য, ধর্ম আর মানুষের জয়ের কথা বলেছিলেন, তেমন তিনি বলতেই পারেন৷ কেননা, তাঁর ওই ধরনের মন্তব্যের মতো এই বিষয়টিও সত্য, ‘পরিবর্তনে’র সরকারে মন্ত্রী হওয়ার পরে সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের অফিসে মদন মিত্রর নাম উল্লেখ ছিল এই ভাবে যে, তিনি সেখানকার কর্মীদের সংগঠনের সভাপতি৷ অথচ, ওই সংগঠনের অস্তিত্ব কোনও দিনই প্রকাশ্যে আসেনি৷ তার উপর, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার জেরে এবং প্রকাশ্যে আসা ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী এই বিষয়টিও সত্য যে, শুধুমাত্র মদন মিত্র মানেই গোটা সারদাকাণ্ড হতে পারে না৷

আরও পড়ুন: সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!

একই সঙ্গে আবার, মন্ত্রী হিসেবে মদন মিত্রের প্রভাব আর ‘পরিবর্তনে’র সরকার গঠনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা হিসেবে মদন মিত্রর প্রভাব নিয়েও আলোচনা-বিতর্ক কম হতে পারে না৷ জোরদার বিতর্ক চলতে পারে তাঁর এ বারের প্রার্থীপদ নিয়েও৷ তেমনই, এই বিষয়টিও সত্য নয়, তাও কীভাবে সম্ভব যে, তিনি যেমন মদন মিত্র, তেমনই, তিনি আবার ‘পরম মিত্র’-ও! যে কারণেও হয়তো বিভিন্ন সময় তাঁর খাস অনুগামীদের তরফে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, বিভিন্ন সাংবাদিকও মদন মিত্রর কাছে বিভিন্ন সময় উপকৃত হয়েছেন৷ যদিও, সারদাকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়ার আগে থেকেই দফায় দফায় ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন তিনি৷ যে কারণে, কখনও বেসরকারি হাসপাতাল, কখনও আবার এসএসকেএম হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলেছিল৷ আর, গ্রেফতারের প্রায় ১১ মাস পরে যখন জামিন পাওয়ার পরের দিন-ই তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার জন্য সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তখনও তাঁর পিছু ছাড়েনি বিতর্ক৷ তিনি ‘পরম মিত্র’ বলেও হয়তো এমন…!

আরও পড়ুন: রাজ-‘কুৎসা’য় যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা…!

এ দিকে, এমন প্রশ্নও উঠেছে, কেমন চিকিৎসা করছিলেন এসএসকেএম হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা, যে কারণে মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও মদন মিত্রকে তাঁরা সুস্থ করে তুলতে পারছিলেন না, আর, জামিনের পরের দিনই তিনি বাড়ি ফেরার মতো সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন? যদিও, তথ্য জানার অধিকার আইনে মদন মিত্রর চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চেয়েছিল অনাবাসী ভারতীয় চিকিৎসক কুণাল সাহার সংগঠন, পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট (পিবিটি)৷ ওই সংগঠনের তরফে এমনই জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী এমন হয়েছে মন্ত্রী মদন মিত্রর, যে কারণে, মাসের পর মাস ধরে তাঁকে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে? একই সঙ্গে পিবিটি-র এমন উদ্বেগও ছিল, তা হলে কি মদন মিত্রর রোগনির্ণয় করতে পারছেন না এসএসকেএম হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা!! না কি, হাসপাতালে তাঁর সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না!! তবে, তথ্য জানার অধিকার আইনেও পিবিটিকে দেওয়া হয়নি কোনও উত্তর৷ কেন-ই-বা দেওয়া হবে উত্তর! উত্তর কি আদৌ দেওয়া যায়!! যে কারণেও বিষয়টি কার্যত এমন ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, কে হে তুমি পিবিটি!!

আরও পড়ুন: বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর

শুধুমাত্র তাই নয়৷ তথ্য জানার অধিকার আইন পালনের ক্ষেত্রে রাজ্যের পয়লা নম্বর সরকারি ওই  হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাবখানাও কার্যত তখন এমন প্রকাশ পেয়েছিল যে, এসএসকেএম হাসপাতালে মন্ত্রীর ‘মিত্র’ সংখ্যা কম পড়েনি৷ যে কারণেও না, গ্রেফতার হওয়ার পরে, ‘অসুস্থ’ মদন মিত্রর রোগনির্ণয়ে ২০১৪-র ডিসেম্বরে এসএসকেএম হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকদের হিমশিম খাওয়া ছাড়াও অন্য কোনও উপায়-ও ছিল না৷ কিন্তু, এই বিষয়টি যেহেতু মেডিক্যাল এথিকসের সঙ্গে জড়িত, সে কারণে বিভিন্ন মহল থেকে এমন প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রী মদন মিত্রর চিকিৎসায় গঠিত এসএসকেএম হাসপাতালের ওই মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকদের ভূমিকাও কেন খতিয়ে দেখা হবে না? তবে, ওই ‘মিত্র’দের জন্যেও আবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়নি স্বয়ং মদন মিত্রকে, তাও নয়! কেননা, মন্ত্রী হিসেবে কতটা প্রভাবশালী ছিলেন মদন মিত্র, সেই বিষয়টিও তাঁর পিছু ছাড়ছিল না৷ সারদাকাণ্ডে মদন মিত্রর কোনও প্রভাব ছিল কি না, সেই বিষয়টিও হয়তো স্পষ্ট হবে আদালতে৷ তবে, মন্ত্রী অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, যে কোনও ক্ষেত্রেই মদন মিত্রর তুলনা যেন শুধুমাত্র তিনিই! তার উপর, এই বিষয়টিও অস্বীকারের নয়, ২০১১-য় ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আগে এবং পরে কীভাবে এসএসকেএম হাসপাতালে মদন মিত্রর কতটা প্রভাব, সে সব বিষয় সেখানকার গ্রুপ-ডি থেকে শীর্ষ স্তরের বিভিন্ন অংশে অজানা নয়৷

‘এম-থ্রি’ এবং ‘মা-মাটি-মানুষ’

সারদা গোষ্ঠীর সঙ্গে রয়েছে অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারিও৷ এ দিকে, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি যেমন এড়াতে পারেনি বামফ্রন্ট পরিচালিত সরকার৷ তেমনই, এড়াতে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারও৷ তবে, প্রকাশ্যে আসা ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী, প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র মানেই যেমন গোটা সারদাকাণ্ড হতে পারে না৷ তেমনই আবার, শর্তাধীন জামিনের পরে যেভাবে মদন মিত্রর অনুগামীদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল উচ্ছ্বাস-উল্লাস, তার জেরে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও কি প্রশ্নের মুখে পড়ছিল না? অথচ, তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ এ রাজ্যের শাসকদলের বিভিন্ন মন্ত্রী-নেতার তরফে যদি সারদাকাণ্ডের দায় শুধুমাত্র বামফ্রন্ট সরকারের উপরেই চাপানো হতে থাকে, তা হলে, সাধারণ মানুষের কাছেও কি স্বয়ং ‘মা-মাটি-মানুষে’র সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক কোনও বিষয় হবে? প্রকাশ্য আসা ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী, সারদা গোষ্ঠীর জন্ম বাম আমলে হলেও, ২০১১-য় ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলেই যেমন সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, তেমনই, এই সরকারের আমলে অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থারও জন্ম হয়েছে৷ কাজেই, শুধুমাত্র কি দায় এড়িয়েই চলবে ‘পরিবর্তনে’র সরকার?

আরও পড়ুন: নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে আইনের বদলে ভরসা ফেসবুক

সারদাকাণ্ডে মদন মিত্রকে গ্রেফতারের আগে এবং পরে যেভাবে বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী সহ শাসকদলের বিভিন্ন মন্ত্রী-নেতাকে, তাতেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন হুঁশিয়ারিও ছিল, সিবিআই যদি মদন মিত্রকে গ্রেফতার করে, তা হলে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসবেন স্বয়ং তিনি৷ মদন মিত্রকে গ্রেফতারের পরে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন উপায়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস৷ তাঁর জামিন না হওয়া পর্যন্ত কলকাতা ময়দানে ধর্না মঞ্চ চালু রাখার কথাও জানানো হয়েছিল৷ তার উপর, মদন মিত্রর গ্রেফতারের বিরোধিতায়, রাজ্যের আইন দফতরের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যর ভূমিকা নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট অবমাননার প্রশ্ন উঠেছিল৷ তবে, মদন মিত্রর শর্তাধীন জামিনের পরে অবশ্য কোনও মন্তব্য করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ অথচ, তিনিই এক সময় এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘কুণাল চোর, টুম্পাই চোর, মদন চোর, মুকুল চোর? আমি চোর?’ এ দিকে, সারদাকাণ্ডের জেরেই তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দলের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলেও প্রকাশ পেয়েছে৷ অথচ, সারদাকাণ্ডের জেরে মুকুল রায়কে সিবিআই নোটিস পাঠানোয়, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন মন্তব্যও প্রকাশ পেয়েছিল, ‘মুকুল রায়ের কিছু হলে লক্ষ লক্ষ মুকুল পথে নামবে৷’ বিরোধীদের তরফে বিভিন্ন সময় এমন মন্তব্যও প্রকাশ পেয়েছে, ‘মা-মাটি-মানুষে’র তিনটি ‘ম’ আসলে ‘মমতা, মুকুল এবং মদন’৷

আরও পড়ুন: বিবিধের মাঝে দ্বেষ-প্রেমের উগ্র জাতীয়তাবাদের মিলন মহান!

বিরোধীদের তরফে ওই ধরনের অভিযোগ থাকতে পারে৷ তেমনই আবার, স্বাভাবিক ভাবেই ‘মা-মাটি-মানুষে’র সরকারের ‘সাফল্যে’র বিভিন্ন কাহিনি বিভিন্ন উপায়ে প্রচারিত হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে৷ যে কারণেও হয়তো, সারদাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন এবং তৃণমূল কংগ্রেস ভবনের সামনে জমায়েত হয়েছিলেন৷ এবং, যে কারণেও হয়তো, সারদাকাণ্ডে জামিন মেলার পরের দিন বাড়ি ফেরার সময় সুস্থ মদন মিত্র-ও মানুষের জয়ের কথা-ই বলেছিলেন৷ মুখ্যমন্ত্রী হোন অথবা কোনও মন্ত্রী কিংবা দলের বড় বা ছোট মাপের কোনও নেতা, বিভিন্ন সময় তাঁদের তরফে এমনও মন্তব্য করা হয়েছে, মানুষ-ই বিচার করবেন৷ অথচ, সারদাকাণ্ডকে ঘিরে শাসকদলের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে অস্বস্তি৷

সিবিআই আর ‘ভাগ শুধু ভাগ’

প্রকাশ্যে আসা ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী, সারদার জাল শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেও বিস্তৃত ছিল না৷ তবে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-২ সরকারের শেষের দিকে সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট৷ সারদার পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থাও রয়েছে সিবিআইয়ের এই তদন্তের আওতায়৷ কিন্তু, সারদাকাণ্ডের সঙ্গে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও যোগাযোগ না-ই-বা হয়ে থাকে, তা হলে শাসকদলের বিভিন্ন অংশে কেন বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়ে চলেছে অস্বস্তি? সারদার পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে৷ কিন্তু, চিটফান্ড কেলেঙ্কারির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না হয়ে থাকলে, কেন-ই-বা সিবিআই তদন্ত আটকাতে সুপ্রিম কোর্টে লড়তে হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে? ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট পরিচালিত সরকারের কারণে পশ্চিমবঙ্গের উপর ঋণের বোঝা অনেক বেড়ে গিয়েছে বলে অর্থসংকটের সমস্যায় পড়ার কথা বিভিন্ন সময় জানিয়ে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্য মন্ত্রী-নেতারাও৷ অথচ, সারদাকাণ্ডে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ জড়িত না থাকে, তা হলে, সিবিআই তদন্ত আটকাতে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ের জন্য কেন খরচ করতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ‘পরিবর্তনে’র সরকারকে? তা হলে, স্বাভাবিক ভাবেই এমন প্রশ্ন-ই ওঠে যে, সারদাকাণ্ডে এমন কোন গোপন কাহিনি রয়েছে, যে কাহিনি প্রকাশ্যে আসতে দিতে চাই না তৃণমূল কংগ্রেস?

আরও পড়ুন: দুর্বারকে অচ্ছুৎ রেখে সোনাগাছিতে স্বাবলম্বন স্পেশাল

সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এবং তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের অধিকাংশ নিশ্চয় সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন৷ একই সঙ্গে প্রত্যাশাও করেছেন, শেষ পর্যন্ত বিচার মিলবে৷ এ দিকে, কেন্দ্রে এখন বিজেপি পরিচালিত সরকার৷ এবং, বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগও উঠেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না সিবিআই৷ যে কারণে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত চললেও, কেন্দ্রীয় ওই সংস্থার উপর ফের ওই প্রভাবের অভিযোগও উঠছে৷ কোনও কোনও মহলে এমন আশঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আদৌ সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড কেলেঙ্কারির সিবিআই তদন্তের জেরে বিচার পাবেন তো ক্ষতিগ্রস্তরা? সারদাকাণ্ডে রাজ্য সরকারের তদন্তের সময় বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি লোপাট হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল৷ নির্বাচনী প্রচারে এসে কলকাতায় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের মন্তব্যেও ফের প্রকাশ পেয়েছে ওই প্রমাণ লোপাটের বিষয়টি৷

আরও পড়ুন: সরকারি অর্থ মেলেনি বলে গরিব-বাড়ির ভরসা ক্লাব!

অথচ, ২০১৪-র ৩০ নভেম্বর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিং এমন বলেছিলেন, ‘২০১৪-য় হবে ভাগ মদন ভাগ৷ ২০১৫-য় হবে ভাগ মুকুল ভাগ৷ ২০১৬-য় হবে ভাগ মমতা ভাগ৷’ ২০১৪-র ১২ ডিসেম্বর মদন মিত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল৷ তার পরে পরিস্থিতি এমন তৈরি হয়েছিল যেন সারদাকাণ্ডের জেরে মুকুল রায়কেও গ্রেফতার করা হবে৷ তবে, মুকুল রায়ের পৃথক দল গঠনের জল্পনা থেকে শুরু করে ফের তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সহ সভাপতির পদ গ্রহণও প্রত্যক্ষ করেছে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন অংশ৷ এই বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে, ‘মুকুল রায়কে ডিস্টার্ব করা হয়েছিল৷’ কিন্তু, কী হবে সারদাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের? আদৌ কি বিচার পাবেন ক্ষতিগ্রস্তরা? তেমনই, চিটফান্ড কেলেঙ্কারি মানে শুধুমাত্র আবার সারদা গোষ্ঠীও নয়৷ তার সঙ্গে অন্যান্য বড় মাপের চিটফান্ড সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে অ্যালকেমিস্ট, রোজভ্যালি, এমপিএস৷ আর, তুলনায় আকারে ছোট এবং তার থেকেও ছোট মাপের অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারিও রয়েছে৷ সব মিলিয়ে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অন্তত সাড়ে চার কোটি বলে জানিয়েছেন চিটফান্ড সাফারার্স ইউনিটি ফোরামের আহ্বায়ক অসীম চট্টোপাধ্যায়৷

‘যা গেছে তা গেছে’ আর ৫০০ কোটি

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো আসল কথাটা বলেই দিয়েছেন৷ যে কারণে হয়তো সারদাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এমন বলতে পেরেছিলেন, ‘যা গেছে তা গেছে’! আর, সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশের জেরে মুখ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যও প্রকাশ পেয়েছিল, সিবিআই কেন, সিবিআইয়ের বাবা তদন্ত করলেও তাঁর কোনও আপত্তি নেই৷ তিনি তো বেঁচে গেলেন৷ চার লক্ষ মানুষের টাকা তাঁরা ফেরত দিয়েছিলেন৷ এ বার সিবিআই টাকা ফেরত দিক৷ তাঁদের আর কোনও দায়িত্ব রইল না৷ তিনি এবং তাঁর সরকার বেঁচে গেলেন৷ এর পর সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপির ঘরে ঘরে গিয়ে বাংলার মানুষ টাকা চাইবেন৷ যদিও, কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র, আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যর এমন বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছিল, কোষাগার থেকে রাজ্য সরকার যেভাবে টাকা দিচ্ছে, সেটাও এক কেলেঙ্কারি৷ এই বিষয়ে ভবিষ্যতে তদন্তের প্রয়োজন৷ এই কেলেঙ্কারি সারদা গোষ্ঠীর৷ যে কারণে, টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্বও ওই গোষ্ঠীর, সিবিআইয়ের নয়৷

আরও পড়ুন: দাভোলকর-পথে কুসংস্কারের ক্রম মুক্তি হবে বাংলায়!

তবে, সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের তরফে এমন বলা হয়েছিল, চিটফান্ড কেলেঙ্কারির ঘটনায় বৃহত্তম ষড়যন্ত্র রয়েছে৷ এই জাল আন্তর্জাতিক স্তরেও ছড়িয়েছে৷ গোটা কাণ্ডে বেশ কয়েক জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে৷ মোট প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি৷ যার জেরে ২৫ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷ এমনকী, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ যথাযথ তদন্ত করতে পারেনি বলেও জানানো হয়েছিল৷ তবে, অসীম চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনই বলেছে, শুধুমাত্র সারদা চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে৷’’ আর, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ? তিনি বলেছেন, ‘‘অন্তত ৯০ লক্ষ পরিবার অর্থাৎ, প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন করে সদস্য ধরা হলে সাড়ে চার কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷ বড় মাপের অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থাগুলির মধ্যে যেমন রয়েছে রোজভ্যালি, এমপিএস৷ তেমনই রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কে ডি সিংয়ের অ্যালকেমিস্ট-ও৷ অন্য অনেক চিটফান্ড সংস্থাও রয়েছে৷ ২০-২৫ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে, এমন ছোট ছোট চিটফান্ড সংস্থাও কম নেই৷’’ একই সঙ্গে অসীম চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তবে, ৫০০ কোটির মধ্যে ২৬৭ কোটি টাকা রিলিজ করা হয়েছিল৷ তার মধ্যে ১৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু, ওই ১৩০-এর মধ্যে ফেরত এসেছে ১০৩ কোটি টাকা৷ অর্থাৎ, মাত্র ২৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে৷’’ তবে, ক্ষতিগ্রস্তদের যে তালিকা অনুযায়ী ওই ২৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেই বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি৷

সারদা বনাম নারদ এবং ২০১৬ আর শান্তিকল্যাণ

সারদা গোষ্ঠীর কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারিও প্রকাশ্যে এসেছে৷ কাজেই, চিটফান্ড সংস্থাগুলির কেলেঙ্কারি অর্থাৎ, সারদাকাণ্ডের জেরে শুধুমাত্র যে বিশাল অংকের টাকার দুর্নীতি হয়েছে, তাই নয়৷ কারণ, এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার এজেন্ট, আমানতকারী মিলিয়ে ১২৭ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রকাশ্যে এসেছে৷ সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে অন্য রাজ্যেও রয়েছে আত্মহত্যার ঘটনা৷ যেমন, সারদাকাণ্ডে তলবের জেরে অসমের প্রাক্তন এক ডিজি আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলেও প্রকাশ পেয়েছে৷ তার উপর, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই সারদাকাণ্ডের জেরে আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে, এমনও ঘটনাও প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন সময়৷ সারদাকাণ্ডের জেরেই কলকাতার এক সাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে আত্মহত্যার পথ৷ অথচ, ওই সাংবাদিকের আত্মহত্যার খবর প্রকাশ্যে আসেনি৷ যে কারণে, এমনও প্রশ্ন ওঠে, প্রকাশ্যে না আসা বিভিন্ন ঘটনার জন্য চিটফান্ড সংস্থাগুলির এই কেলেঙ্কারির জেরে কত মানুষ যে কত রকম ভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এখনও পর্যন্ত সে সব কি আদৌ স্পষ্ট?

আরও পড়ুন: সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বন্ধ সরস্বতী পুজো!

অথচ, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ই বিভিন্ন সময় এমন বলে চলেছেন, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার জন্ম হয়েছিল বাম আমলে৷ যে কারণে, বিভিন্ন মহলে এমন বিভিন্ন প্রশ্নও উঠছে, এ ভাবে কি চিটফান্ড কেলেঙ্কারির দায় এড়িয়ে চলছেন ‘পরিবর্তনে’র সরকারের মুখ্যমন্ত্রী? তা হলে, বামফ্রন্ট আমলে জন্ম নেওয়া সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কী করেছে ‘পরিবর্তনে’র সরকারের প্রশাসন? না কি, শুধুমাত্র বাম আমলে জন্ম নিয়েছে বলেই কোনও দায় থাকে না? অথচ, এ ভাবে বাম আমলের উপর দায় চাপানোর জেরে তো সাধারণ মানুষের প্রতিই ‘মা-মাটি-মানুষে’র সরকারের কোনও দায় নেই বলেই প্রকাশ পাচ্ছে৷ যদিও, সারদাকাণ্ডের জেরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপায়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন অংশে অস্বস্তিও প্রকাশ পেয়েছে৷ কিন্তু, তৃণমূল কংগ্রেসের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে নারদ নিউজের স্টিং অপারেশন ‘এক্স ফাইলস’৷ বিভিন্ন মহলের এমন ব্যাখ্যা, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে যেভাবে অস্বস্তিতে পড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস, নারদ নিউজের স্টিং অপারেশন জেরে তার থেকেও বেশি অস্বস্তিতে পড়েছে শাসকদল৷ কারণ, যেভাবে ওই ‘এক্স ফাইলসে’র ভিডিয়োয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রী-বিধায়ক-সংসদ সদস্যদের টাকা নিতে দেখা গিয়েছে, অভিযোগ সত্ত্বেও সেভাবে কোনও ভিডিয়োর মাধ্যমে প্রকাশ পায়নি সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির সঙ্গে শাসকদলের বিভিন্ন স্তরের যোগাযোগের বিষয়টি৷

আরও পড়ুন: বঙ্গ-জোট জল্পনায় স্বরাজ অভিযানের বিকল্প রাজনীতি

তার উপর, ‘এক্স ফাইলসে’র আনএডিটেড ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসার পরেও গোটা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে৷ নারদ নিউজের ওই স্টিং অপারেশনের জেরে তদন্ত করছে লোকসভার এথিক্স কমিটি৷ ‘এক্স ফাইলসে’র উপর ভিত্তি করে দায়ের হওয়া তিনটি জনস্বার্থ মামলা চলছে কলকাতা হাইকোর্টে৷ এ দিকে, মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আর ওই ভিডিয়ো জাল হিসেবে দাবি করলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্তব্যে এমন প্রকাশ পেয়েছে যে, ওই স্টিং অপারেশনের সত্যতা কার্যত তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের অনেক আগেই অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে নারদকাণ্ডে দলের অস্বস্তি৷ তেমনই, কলকাতা হাইকোর্টে দলেরই অন্য এক সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে ঘুষ এবং অনুদানের মধ্যে ফারাকের বিষয়টি প্রকাশ পওয়ার জেরেও অস্বস্তি এড়াতে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেস৷ এ দিকে, ২০১৩-য় ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০১৪-য় লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৫-য় কলকাতা সহ রাজ্যের ৯২টি পুরসভার নির্বাচনে সারদাকাণ্ডের প্রভাব তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকের উপর সেভাবে পড়েনি বলেও প্রকাশ পেয়েছে৷

আরও পড়ুন: বাঙালি বলে নেতাজিকে হতে দেওয়া হয়নি প্রধানমন্ত্রী!!

যদিও, ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে ‘এক্স ফাইলসে’র এডিটেড এবং আনএডিটেড ভিডিয়ো ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হবে বলেও মনে করছে বিভিন্ন মহল৷ যে কারণে, ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে খোদ নির্বাচন কমিশনকেও তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ দলের অন্য নেতা-কর্মীরা আক্রমণ করছেন বলেও বিভিন্ন মহলের ব্যাখ্যায় প্রকাশ পাচ্ছে৷ আর, তার জেরেই এমন প্রশ্নও উঠছে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের বিষয়টি কতটা সুরক্ষিত? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তাঁর দলের অন্য নেতারাও বলছেন, ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন হয়েছে৷ কাজেই, স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়ন যখন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার এবং মানুষের উপর যখন আস্থা রাখার কথাও বলা হচ্ছে, তখন ফের শাসনক্ষমতা দখলে আনতে কেন বিভিন্ন উপায়ে সন্ত্রাসের পরিস্থিতি তৈরি করতে হচ্ছে? তা হলে কি, আদৌ উন্নয়ন হয়নি? সবটাই আসলে প্রচার? যে কারণে, ফের ক্ষমতা দখলে আনতে এই ধরনের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে শাসকদলকে? তা হলে কি ‘এক্স ফাইলসে’র আতঙ্ক গ্রাস করেছে?

আরও পড়ুন: তসলিমা আদর পাননি বলে বঙ্গ-কমিউনিস্টরা ফেক!

তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকের উপর সারদাকাণ্ডের প্রভাব সেভাবে পড়েনি বলে নারদ নিউজের ওই স্টিং অপারেশনের প্রভাব পড়বে না৷ অথবা, সারদাকাণ্ডের প্রভাব পড়েনি কিন্তু ‘এক্স ফাইলসে’র জেরে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংক অক্ষত থাকবে না৷ এই দুই বিষয়েও বিতর্ক চলছে বিভিন্ন মহলে৷ তবে, এই দুই বিষয়ের মধ্যে কোন বিষয়টি জিতবে আগামী ১৯ মে, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ যে সব প্রশ্ন কোনও কোনও মহলে উঠছে, সে সব হল, সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত শেষ হতে এখনও কত দিন সময় লাগবে? সিবিআই তদন্তের মাধ্যমে আদৌ কি প্রকাশ পাবে সত্য? সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ডে ক্ষতিগ্রস্তরা কি আদৌ বিচার পাবেন? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারদাকাণ্ডে তদন্ত করছে সিবিআই৷ বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা রয়েছে৷ যে কারণে, এমন প্রত্যাশাও রয়েছে, সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়ার উপর কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলেও, শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের জন্যই একদিন না একদিন প্রকাশ হবে সত্য৷ তার জন্য শান্তিকল্যাণ-ও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷

_________________________________________________________________

আরও পোস্ট এডিট এবং খবর:
(০১) পথ-প্রান্তিক শিশুদের জন্য কলকাতায় এখন টয় ব্যাংক
(০২) #TagGeneration এবং গণতন্ত্র আর নির্বাচন কমিশন
(০৩) গ্রামে না গেলে বিশেষজ্ঞ হতে পারবেন না ডাক্তাররা!
(০৪) ভালোবাসার উৎসবে কলকাতায় এলজিবিটি-রামধনু
(০৫) ঘরে-বাইরে রাজনীতি-অসহিষ্ণুতার আমিরি উপাখ্যান

_________________________________________________________________

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ