সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এখনও ঋতুস্রাব নিয়ে মেয়েদের হাজারও নিয়মের মধ্যে চলতে হয়। সমাজের বহু বাধা রয়েছে। এটা করো না, ওটা করো না। পুজোয় বাধা এদের মধ্যে সবথেকে বেশি সামনে চলে আসে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজ সংস্কারের উল্টো পথে হেঁটেছিলেন শ্রীশ্রী সারদা মা। মেয়েদের ‘সমস্যার’ দিনেও তিনি করেছেন পুজো, রেঁধে খাইয়েছিলেন শ্রীশ্রী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে।

সমাজের সংস্কারকে পিছনে রেখে যারা এগিয়ে যেতে পারেন তারাই তো প্রকৃত সমাজ সংস্কারক। সারদা দেবীও ভারতের বহু সমাজ সংস্কারকের অন্যতম। এর বিভিন্ন প্রমাণ এবং তথ্য মেলে তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই এবং তাঁর ভক্ত এবং নিজস্ব স্মৃতিচারণ থেকে। ঠাকুরের পেটের সমস্যা ছিল। যার জন্য ইচ্ছা করলেও তিনি বিশেষ ঝালে ঝোলে অম্বলে জাত রান্না খেতে পারতেন না। খেলেই পেটের মধ্যে শুরু হত গুরুপাক। পাশাপাশি তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র স্ত্রী সারদামণি হাতে রান্না খেলেই তিনি সুস্থ থাকবেন।

কিন্তু সে যুগের সমাজ সংস্কার! তা কি করে বাদ দেন তিনি? স্ত্রী সমস্যার ওই কয়েকদিনে অন্য হাতের রান্না খেতে হত। আর খাওয়া মানেই সমস্যা শুরু। মন এবং সমাজের সংস্কার ভেঙে তিনি স্ত্রী’কে বললেন রান্না করতে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের সময় এসব ধারনার বাইরে। মেয়েদের ওই সময় ঘর থেকে বেরনোই মানা ছিল। স্বামী বললেন, স্ত্রী একটুও না চমকে রাঁধলেন। ঠাকুর সে রান্না খেয়ে বাঁচলেন।

এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রী মা এবং ঠাকুরের কথোপকথন কেমন ছিল ? মায়ের তাঁর স্মৃতি কথায় বলেছেন, “ঠাকুর বড়ই পেটরোগা ছিলেন। সেই জন্য আমি তাঁর ইচ্ছেমত শুক্তো, ঝোল এসব রেঁধে দিতাম। কিন্তু মেয়েদের অশুচি তিনদিন ওসব করতে পারি না, সে কয় দিন মায়ের ওখান থেকে প্রসাদ আসত।” সেই খাবার খেলেই ঠাকুরের অসুখ শুরু। একদিন ঠাকুর মা’কে বলেন, “দেখ, তুমি ও-কদিন রাঁধলে না?” মায়ের উত্তর,”মেয়েদের অশুচির তিনদিন কাউকে রেঁধে দিতে পারে না।”

ঠাকুর বলেন, “কে বললে পারে না? তুমি আমাকে দেবে, তাতে দোষ হবে না। বল তো, অশুচি তোমার শরীরের কোন্ জিনিসটা? চামড়া, না মাংস, না হাড়, না মজ্জা? দেখ, মনই শুচি অশুচি। বাইরে অশুচি বলে কিছু নাই।” এরপর হতে আমি সর্বদা রান্না করে দিতুম। একবার ওই সময়ে পূজাদি সম্বন্ধে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি সারদা দেবীকে বলেছিলেন, “যদি পূজা না করলে মনের কষ্ট হয় তবে করবে, নতুবা নয়।”

তথ্য সুত্র : মায়ের আত্মকথা