তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: উচ্চবর্ণের কোন হিন্দু ব্রাহ্মণ নন। এখানে পুজো করেন এক মধ্যবয়স্কা আদিবাসী রমণী। গত ষোলো বছর ধরে এই ছবি দেখতে অভ্যস্ত এখানকার মানুষ। ঘটনাস্থল বাঁকুড়া শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে হিড়বাঁধ ব্লকের আদিবাসী প্রধান দোমোহানি গ্রাম৷ সেখানেই এখন ঘরের মেয়েকে বরণ করে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে।

চিরাচরিত সংস্কৃত মন্ত্র নয়। নিজেদের ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করে পুজো করেন প্রধান পুরোহিত সরস্বতী হাঁসদা। এই পুজো সম্ভবত জেলার একমাত্র আদিবাসীদের পুজো।

পুজোর মূল উদ্যোক্তা ও প্রধান পুরোহিত সরস্বতী হাঁসদা বলেন, ‘‘১৬বছর আগে এমনই এক পূজার আগে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলাম৷ কিন্তু দুর্গা পূজা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় ও মন্ত্র না জানা ও বিপুল খরচ বহনের অক্ষমতার কথা দেবীকে জানাই৷ স্বপ্নাদেশে দেবী বলেন, নিজের মতো করে পুজা করতে। মন্ত্র জানার কোনও দরকার নেই। ভক্তিই আসল মন্ত্র। তারপর থেকে দেবী দশভুজার মূর্তি তৈরি করে পুজা শুরু। সাঁওতালী ভাষাতেই দেবীর পুজো করি।’’

              পড়ুন: মমতার পায়ে ধরে গোর্খাল্যান্ড চাইলেন ‘অসুর’ গুরুং

গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে আশ্রমিক পরিবেশে টিনের চালা ঘর। সেখানেই চলে দেবী আরাধনা। প্রচলিত দুর্গা এই পুজোয় আদিবাসী সমাজের নিজস্ব অস্ত্র দেবীকে সমর্পণ করা হয়। দেবীর সঙ্গেই পুজা করা হয় টাঙ্গি, বল্লম, তীর, ধনুকের মতো অস্ত্রেরও। তবে শুধু আখ-কুমড়ো বা ছাগ বলি নয় এখানে যেকোনও ধরণের বলিই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। সপ্তমীতে স্থানীয় পুকুর থেকে মঙ্গলঘট সহ নবপত্রিকা আনা হয়। দশমীতেই বিসর্জন।

সরস্বতীদেবী জানান, নির্দিষ্ট কোনও বাজেট বা চাঁদা আদায়ের কোন ব্যাপার এখানে নেই। নিজে সারা বছর কিছু কিছু জমা করি। তাছাড়া পুজো দেখতে আসা সাধারণ মানুষের মাকে দেওয়া প্রণামীর টাকা থেকে পুজোর খরচ উঠে যায়। পুজোর ক’টা দিন পার্শ্ববর্তী খাতড়া, হিড়বাঁধ, ইন্দপুর ব্লক থেকেও অসংখ্য মানুষ আসেন এই ব্যতিক্রমী পুজোর টানে। পুজোর পাশাপাশি আদিবাসী নাচ আর গানে আমোদিত মানুষ এক অন্যরকম ভালো লাগা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তখন প্রতীক্ষা আরও একটি বছরের।