সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ষাটের দশকের প্রথম দিক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী অধ্যাপকদের সভায় এসেছেন ভারতের সেনানায়ক ফিল্ড মার্শাল কে এম কারিয়াপ্পা। তখন চিন ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ শেষ হয়েছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে চলছে কমিউনিস্ট বিরোধী আক্রমণ।

তখন সংবাদপত্রের লেখা কার্টুন থেকে শুরু করে পাড়ায় পাড়ায় দেশপ্রেমিকদের আক্রমণে বিদ্ধ হচ্ছে কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্ট মানেই যেন দেশবিরোধী তকমা দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে সভা। ছাত্র-ছাত্রীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সেখানে ভাষণ দিতে এসেছেন ফিল্ড মার্শাল কে এম কারিয়াপ্পা।

তার ভাষণে দেশপ্রেমের প্রথম পাঠই হল – কমিউনিস্টদের বয়কট করো কারণ ওরা দেশদ্রোহী। এই কারিয়াপ্পা আবার ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন ব্রিটিশদের সেবাদাস। তখন ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করেছেন, ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ করেছেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই ব্যক্তির অবস্থান বদলেছে তাই ষাটের দশকে এই ব্যক্তি দাবি করছেন দেশপ্রেমিক হিসেবে।

অন্যদিকে ওই সময় কমিউনিস্ট হওয়ায় দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন গণেশ ঘোষ, বিনয় চৌধুরী, প্রমোদ দাশগুপ্ত, মুজাফফর আহমেদ , নারায়ণ রায়, সুধাংশু দাশগুপ্ত প্রমুখরা। যারা এক সময় ব্রিটিশের জেলখানায় অথবা কালাপানি পার হয়ে সেলুলার জেলে কাটিয়েছেন।

সেদিন ভাষণ দিতে গিয়ে ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পা ছাত্র-ছাত্রী অধ্যাপক শিক্ষা কর্মীদের দেশ প্রেমের পাঠে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেছিলেন – কোনও ছাত্রী কমিউনিস্টকে বিয়ে করবেন না, কোনও অভিভাবক কমিউনিস্টের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। এমন কথা শুনে সবাই চুপচাপ।

সভার পরিবেশ দেখে জেনারেলের মনে হল দেশের জন্য জীবন দিয়ে দেবে এমন উৎসাহ তো প্রকাশ করছে না উপস্থিত দর্শক শ্রোতারা। তাই আরও এক ধাপ এগিয়ে হুঙ্কারের সুরে তিনি তখন সভায় উপস্থিত লোকজনের সামনে প্রশ্ন করেন- এখানে কেউ কি আছেন যিনি কমিউনিস্ট ? তারপর মুহূর্তের নীরবতা।

সভার অবস্থা দেখে কারিয়াপ্পার মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠছে, ঠিক তখনই সদ্য যৌবনে পা দেওয়া এক তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে- হ্যাঁ এখানেই একজন আছে, আমি একজন কমিউনিস্ট। ওই সময় কারিয়াপ্পার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তাকে এভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে তিনি তা কল্পনাও করতে পারেননি।

সামনে দাঁড়ানো শীর্ণকায় ছেলেটির সাহস দেখে হতভম্ব হয়ে যান তিনি। আর যাদবপুর ক্যাম্পাসে ওঠা ওই প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা থেকে সারা রাজ্যে। ওই ছেলেটির নাম শঙ্করগুপ্ত । ষাট সত্তর দশকে নানা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শঙ্কর গুপ্ত ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গড়লে শঙ্কর গুপ্ত হন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক সচিব।

১৯৮২ সালে তিনি যাদবপুর বিধানসভা থেকে ভোটে দাঁড়িয়ে জেতেন। তাঁকে দ্বিতীয় বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৮৩ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে শঙ্কর গুপ্ত মৃত্যু হয়। তথ্য ঋণ- ৬০-৭০ ছাত্র আন্দোলন: শ্যামল চক্রবর্তী- Sankar Gupta: Wikipedia

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।