তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: প্রাচীন বিষ্ণুপুর ঘরাণার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রসারে শুরু হয়েছে বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যাল। রাজ্য পর্যটন দফতরের উদ্যোগে জোড় শ্রেণীর মন্দির প্রাঙ্গন ‘পোড়া মাটির হাটে’ তিন দিনের এই মিউজিক ফ্যাস্টিভ্যালে বিষ্ণুপুর ঘরাণার প্রথিতযশা শিল্পীরা ধ্রুপদ পরিবেশন করবেন।

বিষ্ণুপুর রামশরণ সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমবেত সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়৷ উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও পুরপ্রধান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রাজ্যের পর্যটন সচিব সুবীর চট্টোপাধ্যায়, মহকুমাশাসক মানস মণ্ডল প্রমুখ।

পূর্ব ভারতের একেবারে নিজস্ব শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর ধ্রুপদ। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতপ্রিয় বাঙালির মনে সেই সুর অনেকটাই ধূসর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রাজ্য পর্যটন দফতরের এই উদ্যোগ অনেকটাই ধ্রুপদ সঙ্গীত চর্চার বিকাশে আশার আলো দেখাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের হাত ধরে তাঁদের দরবারে বিষ্ণুপুর সঙ্গীত ঘরাণার সূত্রপাত। সঙ্গীত রসিক রাজা রঘুনাথ সিংহ দিল্লীর বাহাদুর খাঁ সাহেবকে নিয়ে আসেন। তিনিই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন। পরে গদাধর, রামশঙ্কর ভট্টাচার্য, যদুভট্ট প্রমুখরা এই সঙ্গীত ঘরাণাকে নতুন রূপ দেন। শোনা যায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম প্রিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন এই বিষ্ণুপুর ঘরাণার বিশিষ্ট শিল্পী যদুভট্ট।

বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষ্যে অপরূপ আলোক সজ্জায় সেজে উঠেছে জোড় শ্রেণীর মন্দির প্রাঙ্গন। এক দিকে পোড়া মাটির হাট, অন্যদিকে সেখানেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদের মূর্ছণা। সব মিলে মিশে যেন একাকার। ইতিমধ্যে এই সঙ্গীতের টানে শহরে এসে পৌঁছে গেছেন দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। এই মুহূর্তে বিষ্ণুপুর বাসীও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন মল্ল রাজাদের তৈরী অসংখ্য প্রাচীন মন্দিরের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপুর ঘরাণার সঙ্গীতের টানেও এবার থেকে আরো বেশী পর্যটক বিষ্ণুপুর মুখী হবেন। আগামী রবিবার পর্যন্ত চলবে মিউজিক ফেস্টিভ্যাল৷

স্থানীয় বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এপার বাংলা, ওপার বাংলার মধ্যে একমাত্র বিষ্ণুপুরেই তার নিজস্ব সঙ্গীত ঘরাণা আছে। এখান থেকেই যদুভট্ট, জ্ঞানপ্রসাদ গোস্বামী, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নামী দামী শিল্পীরা এখান থেকেই উঠে এসেছেন। সেই চর্চা এখনো চলছে। নবীন প্রজন্মও এখন এবিষয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। অনেক দিন ধরেই এই উৎসব হচ্ছে। এক দিকে নয়নাভিরাম টেরাকোটা মন্দির, তার মাঝেই সঙ্গীত উৎসব হচ্ছে। অসাধারণ অনুভূতি বলে তিনি জানান।

বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসক মানস মণ্ডল বলেন, বিষ্ণুপুর ঘরাণাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। জোড় শ্রেণীর ছ’টি মন্দির ছাড়াও বিষ্ণুপুর শহরের মূল সব ক’টি মন্দিরকেই আলোকিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা চোখে পড়ছে বলে তিনি জানান।