অরিজিৎ ভট্টাচার্য: একজন প্রকৃত লেখক বারবার বদলাতে চান নিজেকে। যে পথে তাঁর সহজসিদ্ধি-– তাকে পরিহার করে নতুন পথের খোঁজে বেরোন। এ এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই অভিজ্ঞতা সকলের ক্ষেত্রেই একই। সমরেশ বসুও তাঁর ব্যতিক্রমী নন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যেখান থেকে শেষ করেছিলেন সমরেশ বসুর শুরু বলতে গেলে সেখান থেকেই। মাটির কথা আর মাটি মাখা মানুষের কথা যেভাবে আমরা তারাশঙ্করের লেখা থেকে পেয়েছি তার তুলনা হয় না। তারাশঙ্কর যে মাটির কথা বলেছেন তা রাঢ় বাংলার মাটি। এই মাটিই ভারতবর্ষের রূপ ফুটিয়ে তুলেছিল। সমরেশ বসুর প্রথম দিকের গল্পেও এই বিষয়টা লক্ষ করা যায়। যেমন ‘গুণিন’। তারাশঙ্করের লেখায় যে রাঢ়ের উদাসী প্রকৃতির ছায়া ছিল সর্বত্র, সেই ছায়ায় ঢাকা ছিল গুণিন। মনে হয় বীরভূমের উদাসী প্রকৃতি সমরেশ বসুর লেখায় পরে সেভাবে না এলেও ওই প্রকৃতি থেকে তিনি দেখার চোখ পেয়েছিলেন।

বীরভূম সংলগ্ন সংলগ্ন সাঁওতাল পরগণা এসেছে তাঁর ‘শানা বাউরির কথকতা’-য়। এছাড়া ‘পাপপুণ্য’ গল্পে এসেছে বীরভূমের কথা। বিশেষত এই দুটি গল্পের গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায় গৈরিক মাটি কীভাবে তাঁর ভিতরে প্রবেশ করেছে উদাসী প্রকৃতি নিয়ে। আবার তাঁর উপন্যাসেও ফিরে ফিরে এসেছে এই উদাসী প্রকৃতি। ‘রাইকমল’ কিংবা ‘রসকলি’র কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় মাঠের পর মাঠ, হাওয়া, লালধূলোর কথা।

আমাদের মনে হয় সমরেশ বসু কোনও রকম বাঁধাধরা লিখনরীতিতে বিশ্বাস করতেন না। মানুষকে চেনা, মানুষকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাঁকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। নিতান্ত কৌতূহলে, ভারতবর্ষকে দেখার আকাঙ্ক্ষায় তিনি মহাকুম্ভে হাজির হন, তিনি যেন দেখেছিলেন বীরভূমের গ্রামের ধারে বসা ছোট্ট এক মেলা বাড়তে বাড়তে কুম্ভমেলার রূপ ধারণ করেছে। আজও জানুয়ারির হিমেল হাওয়া আর খবরের কাগজে কুম্ভমেলার সাধু-সন্তদের ছবির পাশাপাশি ফিরে ফিরে আসে সেই অমোঘ নামটা-– ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’। উপন্যাসটার নামের মধ্যেই এমন একটা ছন্দঝংকার নিহিত আছে, যেটা উচ্চারণ করলেই যেন কুম্ভ-দর্শনের পুণ্য অর্জন করা হয়ে যায়। ভারতবর্ষকে চেনার এক সচ্ছল প্রাণময় বর্ণনা-–

“পথের দু’ধারে চলেছে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বোম্বাই, গুজরাট, দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ। কী বিচিত্র তার রূপ! কোথাও রঙিন পায়জামা, পাঞ্জাবি ও ওড়নার সঙ্গে ঘাড়ের ওপর এলানো খোঁপা, দোলানো বেণী। বাঁকা খোপায় ফুল গুঁজে রঙিন রেশমি শাড়িতে টেনে দিয়েছে কাছা। গলায় ঝোলানো বেল্টের সঙ্গে খাপে ঢাকা ছুরি, কোমরে তলোয়ার নিয়ে চলেছে পাঞ্জাবি শিখ। …এরই মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে কস্তা পেড়ে বাংলা শাড়ি আর বাংলা সিঁদুরের আগুনের মতো লাল উজ্জ্বল টিপ ও শাঁখা। সর্বহারা শুভ্রবেশিনী বিধবা। কদাচিৎ বাঙালি কুমারীর মস্ত বড় আঁটখোপা, স্নিগ্ধ মুখে উত্তরপ্রদেশের ধূলি রুক্ষতা। আর কোঁচা দোলানো কিংবা পায়ের গোড়ালি অবধি মালকোচা দেওয়া পুরুষ, আমারই মতো সব টাইপ চেহারার বাঙালি।” (অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, পৃষ্ঠা ৩১, বেঙ্গল পাবলিশার্স)

সমরেশের নানা উপন্যাসে মানবধর্মের বিপুল বিস্তার। আসলে তিনি যেমন রাজনীতি জানতেন, তেমনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানবধর্মকে বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাসই প্রসারিত হয়ে সমরেশকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবনায় ভাবতে সাহায্য করল। আমাদের ভাষায় এল নতুন ধারা। তারাশঙ্কর পারেননি, কিন্তু সমরেশ পেরেছিলেন। এই সুর তারাশঙ্করে থাকলেও সমরেশই প্রথম সেই সুর ধরে নতুন পথ আবিষ্কার করেছেন। দ্রাবিড়, উৎকল, বঙ্গ, বিন্ধ্য, হিমাচলের পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে সমরেশ পেরেছেন ভারতবর্ষের উদাসী মাঠ-প্রান্তর পেরিয়ে এগিয়ে যেতে। পুষ্ট করেছেন বাংলার শিল্প-সাহিত্যকে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ