সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: সাজন আনসারি মহাভারতের ঘোড়ার গাড়ি চালান। মহাভারত মানেই কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ, ঘোড়ার গাড়িতে সওয়ার কুরু পান্ডবরা৷ তাই, সাজন আনসারি-মহাভারত, এই সমীকরণটা ঠিক মেলে না। কিন্তু বাস্তব বলছে এটাই সত্যি। মহাভারতের ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই ত্রিশ বছর ধরে চলছে সাজনের ঘর সংসার।

হাওড়ার টিকিয়াপাড়া থেকে বাইপাস ধরে হাওড়া ময়দানের দিকে যেতে গেলেই একটা ত্রিপলের ছাউনির তলায় দেখা মিলবে সাজনের। সেখানেই তিন ঘোড়া, এক মহাভারত গাড়ি নিয়ে তার ‘ঘর-সংসার’। কিন্তু এই মহাভারতের ঘোড়ার গাড়িটা কেমন গাড়ি? এতো কলকাতার  ভিক্টোরিয়ার সামনে চলা ফিটন গাড়ি। সাজন জানালেন, “এটা ভুল। ফিটন গাড়ি এখান থেকে সব উঠেই গিয়েছে। ওসব আর এখানে পাওয়া যায় না। এই সব গাড়িগুলোর নামই মহাভারত গাড়ি।” এই গাড়ি আনা হয় উত্তরপ্রদেশ থেকে। একটা গাড়ির দাম দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকা। হাওড়ায় সবমিলিয়ে মাত্র তিনটি মহাভারত ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। ওই তিন গাড়ির মধ্যেই একটি সাজনের। এটাই তার দিন গুজরানের ভরসা।

সাজন তখন সাত বছরের। সেই সময় থেকেই এই ঘোড়ার গাড়ি চালানোর প্রতি ভালোবাসা। ‘গুরু’-র থেকেই গাড়ি চালানো শিখেছিল। তারপর কেটে গিয়েছে ক্রমে ত্রিশটা বছর। ছুটে চলেছে সাজনের  মহাভারত গাড়ি। মাঝে কিছু সময় ‘নৌকরি’ করতেও শুরু করেছিল। কিন্তু মন লাগেনি। তাই ফিরে আসা এই ঘোড়ার গাড়ি চালানোর পেশাতেই। তারপরে আর ফিরে তাকায়নি।

ধার করে তিন লক্ষ টাকা দরে কিনেছিল ১০টা ঘোড়া। কিন্তু একটাকেও রাখা যায়নি। সবকটাই মারা যায়। এত ঘোড়া গাড়ি চালাবার ইচ্ছা অথচ ঘোড়াগুলোকেই দেখলেন না? সাজন বললেন, “বছরে কাজ বলতে গ্রীষ্ম আর শীত। বাকি সময়টা রিক্সা চালিয়ে পেট চালাতে হয় আট জনের।” আর কাজের সময়ে ভরসা করতে হয় হিন্দু আর মুসলমানদের পার্বন, পরব, বিয়ে, শাদির উপর। সাজন বলেন, “এইসব করে মাসে মেরেকেটে পাঁচ হাজার টাকা ঘরে আসে।” আর বর্ষা এলেই ঘোড়া জলে নামতে চায় না। তাই কাজ বন্ধ।  “তখন রিক্সা চালাই। আরও কমে যায় রোজগার”। এই খরচের ঠেলা সামাল দিতে পারেননি। স্রেফ বৃষ্টির জলে ভিজে মারা পড়েছিল ১০টা ঘোড়া।

এত কিছুর পড়েও দমে যাননি সাজন। কিনেছেন আরও তিনটে ঘোড়া। তাদের নাম কালো, সাদা-কালো আর রানী। এরাই এখন সব সাজনের। এদের তদারকি করতেই প্রত্যেক দিন ঘাস কেটে আনতে হয়। সঙ্গে রয়েছে ৩০০ টাকা করে আরও খাবারের খরচ। সাজনের কথায়, “এসব কাজ থাকলেও দিতে হবে, না থাকলেও দিতে হবে।” সঙ্গে ঘোড়ার শরীর খারাপ করলে তো আর কথাই নেই।

এত সমস্যা যখন তখন কলকাতার মতো ব্যবসার জায়গা ছেড়ে হাওড়াকে বাছলেন কেন? সাজন বলেন, “এটাই আমার ডেরা। তাই এখানেই কাজ কাম করতে ভালোলাগে।” সে কাজ এলেও ভালো, না এলেও ভালো। বড় দিনের সময় থেকে অবশ্য কলকাতা যান তিনি। কিন্তু বাকি সময়টা হিন্দু-মুসলিমদের আনন্দে পেট ভরিয়ে নেয় সে। তাছাড়া সাজন বিশ্বাস করেন, যার হবার এমনিতেও হবে, ওমনিতেও হবে। নিজের পেশাকে সম্মান করে সে। এইটুকুতেই খুশি সাজন আনসারি।

সাজন চলে শ্বশুরাল…….না, আপাতত: নিজের এলাকাতেই ঘোড়ার রথ চালিয়ে দিন গুজরান করেন হাওড়ার সাজন৷ কলি যুগেও সেই মহাভারতের ঘোড়ার গাড়িতেই বেঁচে থাকার যুদ্ধ চলছে এযুগের সাজনের৷