স্বরলিপি দাশগুপ্ত, কলকাতা- “সেলাই মেশিন এখন বন্ধ। তাতে কী! ওটাও জীবনের লড়াই, এটাও।” শীতের সন্ধ্যায় পার্ক সার্কাস ময়দানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো যিনি বললেন, তাঁর বয়স মেরেকেটে চব্বিশ। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বোরখায় ঢাকা। গোলগাল মুখে চশমার আড়ালে স্রেফ প্রাণোজ্জ্বল দু’টো চোখ দেখা যায়। আর গালজোড়া জাতীয় পতাকা! আশপাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকজনও প্রায় একই চেহারার। তারা বলে, “আমরা এই দিদির কাছে সেলাই শিখি। যা চলছে, আর বসে থাকা যায়নি। আমরা ঘরে বসে থাকবও না।” গলার স্বর শুনে মনে হয়, শুধু রুজিরুটি নয়, চুড়ি পরা হাতগুলো সেলাই মেশিনে শান দিয়েছে আরও মজবুত হয়ে উঠবে বলে।

তপসিয়ার বাসিন্দা এই ‘সেলাই দিদিমণি’র নাম সাইমা আনসারি। গল্পের ছলে বলে চলেন, আগে মহারাষ্ট্রে থাকতেন। পরিবার নিয়ে কয়েক বছর আগেই কলকাতায় চলে এসেছিলেন। কারণ? খরচ সামলানো যায়নি। কলকাতায় তা-ও মানুষ কম খরচে বেঁচে থাকতে পারে। পরিবারের এই খরচের ভাগ নিতেই শুরু নিজের মতো করে পথচলা। বললেন, “মহারাষ্ট্রে থাকাকালীন দ্বাদশের পড়া শেষ করে পোশাকের ডিজাইন করতে শিখেছিলাম। এখানে এসে তাই ওই কাজই শুরু করেছি নিজের চেষ্টায়। দেশের কোনও ব্যবসায়ীই ভালো নেই। সব জিনিসের দাম বাড়ছে। তাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে রোজগার করাটা খুব জরুরি। এমন সব ডিজাইন বানিয়ে দেবো তাকিয়ে থাকবেন।”

গলায় ঝড়ে পড়ে আত্মবিশ্বাস। যা আরও বাড়ে যখন তিনি বলেন, তাঁদের পাড়াতেই দু’কামরার ঘর ভাড়ায় নিয়েছেন। সেখানেই সেলাই শিখিয়ে যৎসামান্য পারিশ্রমিক নেন সাইমা। কিন্তু তাঁর সেলাই স্কুলে এমন মহিলারাও রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে কারও স্বামী তালাক দিয়েছে, কারও স্বামী আবার দিন আনা দিন খাওয়া কর্মী। এমন শিক্ষার্থী তাঁর কাছে বর্তমানে ন’জন। এঁদের থেকে পারিশ্রমিক নেন না তিনি। বরং তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার দিশা দেখান সাইমা। লড়াই করে নিজের অধিকার কী ভাবে অর্জন করতে হয় সেটাই মজ্জাগত করে দেন যেন।

কিন্তু সেই লড়াইয়ের গতিতে ভাঁটা পড়েছে গত ৭ জানুয়ারি থেকে। কারণ সাইমাদের সামনে এখন আরও বড় লড়াই। দেশে নিজেদের ভিটে-মাটি কামড়ে থেকে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই। তাই সেলাই স্কুলের ছাত্রীদের নিয়েই স্কুল বন্ধ রেখে রোজ পার্ক সার্কাসের সিএএ, এনআরসি বিরোধী প্রতিবাদে হাজির থাকছেন সাইমা। অনেকটা সময় থেকে নিজের ছাত্রীদের নিয়েই ফিরছেন রাত ন’টার পরে।

কোনও দিন তাঁরা আজাদির স্লোগান তোলেন, কোনও দিন আবার বোরখায় ঘেরা মুখটায় জাতীয় পতাকা এঁকেই নিজেদের প্রতিবাদ বুঝিয়ে দেন। জোর গলায় বলেন, “হাম কিউ জায়েঙ্গে! ইয়ে হমারা জাগা হ্যায়। হমারা হক কোই হামসে ছিনকে তো দিখায়ে!” সাইমা এই কথাগুলি যতবার বলেন, তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোও যেন আরও জোর খুঁজে পায়। পাশে দাঁড়ানো মহিলাকে দেখিয়ে এরপর সাইমা বলেন, “আমি যেখানে বাচ্চাদের রোজ সেলাই শেখাই। সেখানেই আমার এই বন্ধু আরবি ভাষা পড়ান। কারণ প্রত্যেকের শিক্ষিত হওয়া উচিত। নাহলেই রাজনৈতিক দলগুলি সুযোগ নেবে আর সাধারণ মানুষকে বোকা বানাবে।” চকচক করে ওঠে তরুণীর চোখ।

সেলাই স্কুল চালিয়ে নিজের ভিত শক্ত করছেন, মেনে নিয়েছিল রক্ষণশীল পরিবার। কিন্তু বোরখা পরা মেয়ে রোজ রাস্তায় প্রতিবাদ করতে নামবেন! এমনটা আগে ভেবে দেখেননি সাইমার পরিজনেরা। কিন্তু এই প্রতিবাদে বাধও দেননি তাঁরা। বরং ঘরের মেয়েকে অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে দিয়েছেন। পার্ক সার্কাসের প্রতিবাদ-প্রাঙ্গণের হাতেখড়ি মহিলাদের হাত ধরেই। মহিলা ছাড়াও তাঁদের আরও বড় পরিচয়, তাঁরা মানুষ। কোনও জাত নয়। যেমনটা সাইমা বললেন, “কে হিন্দু, কে মুসলিম তাতে কিছুই যায় আসে না রাজনৈতিক দলগুলির। তারা শুধু আমাদের বোকা বানিয়ে, ব্যবহার করে নিজেদের গদি বাঁচায়।”

ভিড় ও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে চলে স্লোগান। কখনও আজাদির, কখনও ফইজের ‘হাম দেখেঙ্গে’। আবার কখনও স্রেফ জাতীয় সঙ্গীত। আর সেই ভিড়েই মিশে রয়েছে এমন অসংখ্য সাইমা। যাঁরা এই ময়দানের বাইরেও লড়াই করে বেঁচে থাকেন। চুড়ি পরা সেই হাতগুলি কর্মস্থলে থেকে বাড়ি, সমস্তটা নিয়েই লড়াই করেন। পার্ক সার্কাস ময়দানে ঢুকলে মনে হতেই পারে, সেই চুড়ি পরা হাতগুলোতেই এখন দেশের জাতীয় পতাকা নিরাপদ বোধ করছে। এ যেন এক অদ্ভুত ‘সুই ধাগা’র সম্পর্ক!