শুভদীপ রায় চৌধুরী: যিনি সমগ্র জগতের মানুষকে রক্ষা করেন তাঁর দশহাতে, দশপ্রহরণ ধারণ করে যিনি সকলের দুর্গতি নাশ করে চলেছেন তিনিই দুর্গা। দেবীর রয়েছে ত্রিধা শক্তি- ইচ্ছাশক্তি, ক্রিয়াশক্তি ও সাক্ষাৎ শক্তি। ইচ্ছাশক্তিতে তিনি মূলাধারে বিরাজ করেন, ক্রিয়াশক্তির আবহে হয় তাঁর উথ্থান আর সাক্ষাৎ শক্তির প্রকাশে হয় জাগরণ ও মিলন। তিনিই অন্তিমে ব্রহ্মে মিলিত হন। দেবীর গুহ্য প্রকাশ নয়টি রূপে হয়েছে। তাঁর এই নয়টি রূপকেই নবদুর্গা নামে বলা হয়। ঋষি মার্কেণ্ডেয় পিতামহ ব্রহ্মার কাছ থেকেই এই নবদুর্গার রূপ ব্যাখ্যা পেয়েছেন।

‘অস্তি গুহ্যতমং বিপ্র সর্বভূতঃ উপকারকম্।
দেব্যাঃ তু কবচং পুণ্যং তৎ শৃণুষ্ক মহামুনে।।’

দেবীর নানান রূপ নানান ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর উল্লেখও রয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে। মহাভারতেও অর্জুনের দুর্গাস্তবে প্রীতা হয়ে দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখেই উর্দ্ধাকাশ থেকে বললেন অল্পকালেই তুমি শত্রুগণকে জয় করতে পারবে। হে নরশ্রেষ্ঠ অর্জুন, তুমি যুদ্ধে শত্রুদের মধ্যে এমনকি স্বয়ং ইন্দ্রেরও অজেয়, কারণ স্বয়ং নারায়ণ তোমার সহায়। মূলত দেবীই ব্রহ্মলাভের সোপান, তাঁতেই রয়েছেন স্বয়ং পরব্রহ্ম সচ্চিদানন্দ। দেবী দুর্গা জগৎ সমরে, চিত্ত সমরে, সাধন সমরে সমগ্র শক্তি। সেই শক্তিময়ীর আরাধনা বঙ্গেও হয়ে আসছে আজ বহু বছর ধরে। বঙ্গের ঠাকুরদালানে আজও মহামায়ার আরাধনা হয় শারদীয়ায়, তেমনই এক প্রাচীন পরিবারের ঠাকুরদালানে উপস্থিত, সেই দালানের ইতিহাস জানতে ও পুজোর রীতিনীতি জানতে।

কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গাপুজো যে পরিবারে অনুষ্ঠিত হয়, আজ সেই পরিবারের ইতিহাস বর্ণনা করবো, আর পুজোর আচার অনুষ্ঠানেও কী কী থাকে তা আলোচনা করবো। ১৬১০সালে সাবর্ণ গোত্রীয় রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী ভগবতীদেবী শুরু করেছিলেন প্রথম দুর্গাপুজো কলকাতার। লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ই প্রথম সপরিবারে দেবীদুর্গার আরাধনা শুরু করলেন এবং কার্তিককে নিয়ে এলেন একচালায়, কারণ আগে কার্তিক কৃষ্ণবর্ণের ছিল এবং আদিবাসী সম্প্রাদায়ে পূজিত হত। বলাবাহুল্য কলকাতার প্রথম সমাজসংস্কারক এবং দুর্গাপুজোর সূচক ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত।

আনুমানিক দশম শতকে বাংলায় মহারাজা আদিশূর কান্যকুব্জ থেকে পঞ্চ ব্রাহ্মণকে এনেছিলেন পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করবার জন্য এবং তাঁদের বসতি দিয়েছিলেন বাংলার রাঢ় অঞ্চলে। তাই তাঁরা রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ বলেই পরিচিত, সেই পঞ্চ ব্রাহ্মণের মধ্যে ছিলেন বেদগর্ভ যিনি সাবর্ণদের আদিপুরুষ। এই বংশের কুলতিলক পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন হালিশহরসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং হুমায়ুনের একমাত্র ব্রাহ্মণ সেনাপতি, যাঁকে হুমায়ুন “শক্তি খাঁন” উপাধি দিয়েছিলেন। এছাড়া পরিবারের জীয়া গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে কামদেব ব্রহ্মচারী ছিলেন বিখ্যাত তন্ত্রসাধক যিনি “বিদ্যা বাচস্পতি” উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। জীয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্রই হলেন লক্ষ্মীকান্ত, যিনি ১৬০৮সালে মানসিংহের থেকে আটটি পরগণার নিষ্কর জমিদারি পেয়েছিলেন। যেই জমিদারি উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিনে ডায়মন্ডহারবার অবধি বিস্তৃত এবং সাথে পেয়েছিলেন রায়, চৌধুরী এবং মজুমদার উপাধি।

১৬০০সালে সাবর্ণদের হালিশহরে দুর্গাপুজো শুরু হলেও লক্ষ্মীকান্ত সেই পুজো স্থানান্তরিত করেন বড়িশাতে, কারণ সেই সময় বড়িশা উন্নত জনপদ। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয় জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে, তারপর মৃন্ময়ী প্রতিমা নিমার্ণ হয় ঠাকুরদালানে। বর্তমানে এই পরিবারে আটটি পুজো হয়, বড়িশাতে ছয়টি এবং একটি বিরাটিতে এবং একটি নিমতায়। এই বাড়ির পুজো হয় বিদ্যাপতি রচিত “দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী” মতে এবং কৃষ্ণানবমীতে বোধন শুরু হয় আটচালায়, সাথে চণ্ডীপাঠ, হোম, ভোগনিবেদন ইত্যাদি আচারও থাকে। এই বাড়ির প্রতিমা একচালচিত্রের হয় তবে ত্রিচালা বসে, যাকে টানাচৌড়ী বলা হয়। চালচিত্রে দশমহাবিদ্যা ও রাধাকৃষ্ণের পট আঁকা থাকে। দেবীর একপাশে থাকেন শ্রীরামচন্দ্র এবং অন্যদিকে থাকেন মহাদেব, তাঁদেরও নিয়মিত পুজো হয়। মায়ের গায়ের রঙ হয় শিউলি ফুলের বোঁটার মতন এবং বড়বাড়ি, মেজবাড়ি ও নিমতা বাড়িতে সিংহটি ঘোটকাকৃতি হয়। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন সপ্ততীর্থের জল দিয়ে স্নান করানো হয় নবপত্রিকাকে তারপর শুরু হয় মূলপূজা।

সাবর্ণ চৌধুরীদের সমস্ত বাড়িতে আমিষভোগ হলেও নিমতার বাড়িতে নিরামিষ ভোগ হয়। ভোগে থাকে সাদাভাত, খিচুড়ি, পোলাও, নানান রকমের ভাজা, তরকারি, মাছ, চাটনি, পায়েস ও মিষ্টান্ন ইত্যাদি। মহাষ্টমীর সন্ধিপূজায় একটি ল্যাঠামাছ পোড়া দেওয়া হয়। দশমীর ভোগে পান্তাভাত, ইলিশমাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক, চালতার চাটনি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।

মহানবমীর দিন বড়বাড়ি ও বিরাটীবাড়িতে হয় কুমারীপুজো। অতীতে এই পরিবারে পশুবলিপ্রথা থাকলেও বর্তমানে প্রতীকী বলিদান হয়। মহানবমীর দিন ১৮০টি খুড়িতে মাশকলাই ভোগ নিবেদন করা হয় অপদেবতা ও অসুরদের জন্য। দশমীর দিন দেবীবরণের পর কনকাঞ্জলিপ্রথাও রয়েছে এই পরিবারে। অতীতে কাঁধে করে দেবীকে বিসর্জনে নিয়ে যাওয়া হলেও বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ। এই ভাবে ঐতিহ্যের সাথে আজও পুজো হয় সাবর্ণ বাড়িতে।

তথ্য দায় ও লিপিবদ্ধে: শুভদীপ রায় চৌধুরী

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।