ফাইল ছবি

গৌতম রায়: উনিশশো পঁচিশ সালের বিজয়া দশমীর দিন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা হয়। সেই থেকে ধারাবাহিক ভাবে এই বিজয়া দশমীতে, প্রতিষ্ঠা দিবসের দিন সরসঙ্ঘচালক সঙ্ঘকর্মীদের সামনে একটি বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতার ভিতর দিয়ে সঙ্ঘ প্রধান গোটা হিন্দুত্ববাদী পরিমণ্ডলের আগামী এক বছরের রাজনৈতিক, তথাকথিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মপদ্ধতির একটি রূপরেখা দেন।

সেই রূপরেখা কেই হিন্দুত্ববাদী প্রেক্ষাপটের যাবতীয় কর্মপদ্ধতি পরিচালিত হয়ে থাকে। অতীতে সঙ্ঘ পরিমণ্ডলে যখন একটা আশ্চর্যজনক গোপনীয়তা অবলম্বন করা হত, তখন বিজয়া দশমীর দিন সরসঙ্ঘচালকের এই বক্তৃতার বিষয়বস্তু সঙ্ঘের নিজস্ব গণ্ডির বাইরে প্রায় আসতোই না বলা চলে। ২০১৪ সালে সঙ্ঘের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠনের পর সঙ্ঘের অন্যান্য কর্মকাণ্ডে যেমন কৌশলগত কারণেই গোপনীয়তার নেই বজ্রআঁটুনি কিছুটা আলগা করা হয়েছে, তেমনিই বিজয়া দশমীতে সরসঙ্ঘচালকের সঙ্ঘ কর্মীদের সামনে আগামীর পথসংকেত দেওয়ার বিষয়টি ঘিরেও সেই আগের মতো হীমশীতল গোপনীয়তার বাতাবরণ অনেকখানি শীতল করা হয়েছে।

সরকারি প্রচার মাধ্যমকে হিন্দুত্ববাদীদের একান্ত নিজস্ব প্রচার মাধ্যম হিশেবে ধরে নিয়ে টেলিভিশনে সরসঙ্ঘচালকের বিজয়া দশমীর বক্তৃতা এখন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সঙ্ঘের গ্রহণযোগ্যতা আমজনতার ভিতরে তৈরি করার এই রাজনৈতিক হিন্দু সামাজিক প্রযুক্তির ভিতর দিয়ে গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি এখন সংসদীয় ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার বিষয়টিকে কার্যত চিরস্থায়ী করবার এক উন্মত্ত নেশায় মেতে উঠেছে। হিন্দুত্ববাদীদের এই ভয়ঙ্কর প্রবণতার অন্যতা চলতি বছরের বিজয়া দশমীতেও হয়নি। চলতি বছরে প্রতিষ্ঠা দিবসের ভাষণে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তার বক্তৃতায় দেশের বেহাল অর্থনীতিকে নানা আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টার পাশাপাশি গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির এবং তাদের পরিচালিত প্রশাসনের অপদার্থতার দরুন সামাজিক হিংসার ভয়াবহ দিকটিকে আড়াল করবার সবরকম চেষ্টার ভিতর দিয়েই বেশিরভাগ সময় খরচ করলেন।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি দক্ষিণপন্থী অবস্থান নিয়ে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করলেও গত শতকের শেষ দশকের আগে পর্যন্ত তারা এদেশের বৃহৎ বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেনি। বৃহৎ বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব স্বাধীনতার পর একটা দীর্ঘসময় জুড়ে কার্যত একতরফা ভাবে করে গিয়েছে কংগ্রেস। আর আরএসএস এবং তাদের আগের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসঙ্ঘ কিংবা তার বর্তমান বিবর্তিত সঙ্করণ ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিনিধিত্ব করে গিয়েছে মধ্যসত্ত্বভোগী ফড়ে সম্প্রদায়ের। এই মধ্যসত্ত্বভোগী ট্রেডার্সদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবেই নিজেদের বিকাশের কাল থেকে আম্বানি গোষ্ঠী তাদের শ্রেণী সখ্যতার দরুন কাছাকাছি থেকেছে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের।

এই মধ্যসত্ত্বভোগী ফোড়ে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার কারণেই তথাকথিত স্বাদেশিকতার মোড়কে জড়িয়ে গত শতকের নয়ের দশকের মধ্যভাগ, যে সময় পর্যন্ত ছলে বলে কৌশলে সঙ্ঘের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি আসতে পারেনি, সেই সময় পর্যন্ত হিন্দুত্ববাদীরা তাদের শ্রেণী বন্ধুদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশে তথাকথিত স্বদেশি অর্থনীতির কথা বলে যেত। এই পর্যায়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে সঙ্ঘের শাখা সংগঠন ‘স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ’ এবং তাদের তথাকথিত স্বদেশি অর্থনীতির প্রচারের ফানুসের খুব বোলচাল ছিল। অর্থনীতি ঘিরে স্বদেশিয়ানার এই ঢাক্কানিনাদের কৌশল থেকে বিজেপি সরে আসতে শুরু করে এনডিএ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোটের মাধ্যমে বাজপেয়ীর নেতৃত্বে প্রথম দফায় কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের আমল থেকে।

নয়ের দশকের গোড়ার দিকে নরসিংহ রাওয়ের অর্থমন্ত্রী হিশেবে ডঃ মনমোহন সিং যে বাজার অর্থনীতির পথে ভারতবর্ষকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, বাজপেয়ী তিন দফায় ক্ষমতায় থাকার সাড়ে ছয় বছরে সেই বাজার অর্থনীতির পথকেই আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে শুরু করেছিলেন। তবে এই সময়কালে বিজেপির সংসদে একক গরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে জোট রাজনীতির নানা আঞ্চলিক দলের অনেক রকম ব্যক্তি স্বার্থের উপর খানিক নির্ভর করে বিজেপিকে সরকার পরিচালনা করতে হত।

তাই বাজপেয়ী জামানার দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছরে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববর্তী কংগ্রেসি সরকারের বাজার অর্থনীতিকেই অনেক উগ্র ভাবে অনুসরণ করা সত্ত্বেও মৌখিক ভাবে সঙ্ঘের শাখা সংগঠন ‘স্বদেশি জাগরণ মঞ্চে’র মতো সংগঠনগুলিকে দায়ে তথাকথিত স্বদেশি অর্থনীতির বুলি কপচিয়ে যেত। এই পর্যায়ে সঙ্ঘের রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপায়ণে তারা যে শ্রমিক সংগঠন পরিচালনা করে, সেই ‘ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘে’র নেতা দত্তপন্থ ঠেংড়িকে এই স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের ব্যানারেও ব্যবহার করা হত।

আজ প্রতিষ্ঠা দিবসের বক্তৃতায় সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তাদের অতীতের সেই তথাকথিত স্বদেশি অর্থনীতির ধারপাশ দিয়ে হাঁটলেন না। মোদী সরকারের সর্বনাশা বাজার অর্থনীতির পক্ষে নিজের অভিমত রাখতে গিয়ে সঙ্ঘের অর্থনৈতিক ভাবনাকেও মোহন ভাগবত উত্তর থেকে একেবারে দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। দেশের বেহাল অর্থনীতিকে আড়াল করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠা দিবসের বাৎসরিক বক্তৃতায় মোদী প্রশাসনের অনুসৃত বাজার অর্থনীতির ভূয়সী প্রশংসার ভিতর দিয়েই মোহন ভাগবত কার্যত বুঝিয়ে দিলেন, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি এখন একক গরিষ্ঠতায় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রয়েছে।

জোট রাজনীতির বাধ্য বাধকতায় নামে এনডিএ সরকার হলেও শরিক দলগুলিকে খুশি রাখার এতোটুকু দায়বদ্ধতা যে হিন্দুত্ববাদীদের নেই– সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন মোহন ভাগবত। সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা দিবস, বিজয়া দশমীতে এই বছর সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের বক্তৃতার ভিতর দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, জাতীয় স্তরের বুর্জোয়া শক্তির প্রায় গোটা শিবির এবং আন্তর্জাতিক স্তরে বাজার অর্থনীতির ভিতর দিয়ে এখন যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ গোটা বিশ্বটাকে নিজেদের আওতার ভিতরে আনতে চাইছে– এই দুটি শক্তিই এখন একত্রিত ভাবে ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের ভিতরে নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ জোরদার ভাবে সুরক্ষিত থাকবার যাবতীয় ইঙ্গিত পেয়েছে।

তাই সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত তাদের চিরাচরিত অর্থনৈতিক চেতনার ভিত্তি মধ্যসত্ত্বভোগী ফড়ে সম্প্রদায়ের স্বার্থকে স্বদেশি অর্থনীতির আড়ালে দেখবার ভেক সর্বার্থে পরিহার করে জোরদার ভাবে, একদম প্রকাশ্যেই বাজার অর্থনীতির জয়গান গেয়েছেন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে অতীতে যে ধরনের মুখোশ পরে হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে তাদের রাজনৈতিক আগ্রাসন চালাতে হয়েছিল, সেই রাস্তা থেকে যে তারা পরিস্থিতির আনুকূল্য হেতু সম্পূর্ণ ভাবে সরে এসেছেন– মোহন ভাগবতের এইবারের বিজয়া দশমীর বক্তৃতায় তা একদম দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে শ্রেণীস্বার্থের তাগিদে যে তথাকথিত স্বদেশিয়ানার পথে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির হেঁটেছিল, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর সেই ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করবার খোয়াব দেখতে শুরু করা লোকেরা এখন শ্রেণীস্বার্থের গতিমুখকে আরও অনেক তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।

তাই তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মধ্যসত্ত্বভোগী ফোড়ে সম্প্রদায়ের স্বার্থের থেকেও বৃহৎ বুর্জোয়া, আন্তর্জাতিক স্তরে বাজার দখলের ভিতর দিয়ে বিশ্বের অর্থনীতিকে নিজেদের করতলগত করতে যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সবথেকে বেশি তৎপর, তাদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষাকেই সবথেকে আদর্শ আচরণ বিধি হিসেবে ধরে নিয়েছে। সেই ধরে নেওয়ার নগ্ন প্রতিফলন আমরা দেখতে পেলাম মোহন ভাগবতের বিজয়া দশমীর ভাষণের ভিতর দিয়ে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে তথাকথিত স্বদেশিয়ানার ভেক ছেড়ে দিয়ে সরাসরি বাজার অর্থনীতির জয়ধ্বজা উড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন করলেও নিজেদের সন্ত্রাসী মানসিকতাকে চাপা দিয়ে, নিজেদের দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অপকর্মকে আড়াল করতে স্বদেশি- বিদেশির ছদ্মবেশ ধরে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে যে সঙ্ঘ এখনও আগের মতোই সমান ভাবে তৎপর, সে কথা মোহন ভাগবতের বিজয়া দশমীর বক্তৃতায় ‘মব লিঞ্চিং’ প্রসঙ্গে শব্দগত বিভাজনের ভিতর দিয়ে অপরাধকে আড়াল করার প্রবণতা থেকে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

মতামত লেখকের নিজস্ব।