ফাইল ছবি

দেবময় ঘোষ: খুব বেশিদিন নয়৷ বছর দু’য়েক আগের কথা৷ ভারত সফরে এসেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ‘সিপিসি’-এর একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল৷ সবাইকে অবাক করে তাঁরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন৷ আয়োজকরা তো বেশ অবাক৷ ভারতে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সংঘের ‘সাপে-নেউলে’ সম্পর্কের কথা সর্বজনবিদিত৷ চীনা কমিউনিস্টদের সংঘ-সফর কেমন হবে তা নিয়েই রীতিমতো চিন্তিত আয়োজকরা তাই শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত স্বস্তিতে ছিলেন না৷ দিল্লির ঝন্ডেওয়ালেনে সেদিন RSS দপ্তরে সিপিসি-প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংঘ কর্তাদের কথোপকথন কিন্তু মনের রাখার মতো৷ চেনা, প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন চীনা কমিউনিস্টরা৷ কমিউনিস্টদের প্রশ্নের জবাব জুগিয়ে অবাক করেছিলেন সংঘ কর্তারাও৷

সংঘের কর্তারা সিপিসি-এর প্রতিনিধি দলের কাছে জানতে চান, ‘সংঘ সম্পর্কে জানার ইচ্ছা কেন হল আপনাদের?’ সিপিসি-এর প্রতিনিধিদের উত্তর, ‘সংঘের কার্যপদ্ধতি কী রকম জানতে আগ্রহী আমরা ৷ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতো RSS ও একটি ক্যাডারদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন৷ সেটাই আগ্রহের কারণ৷’ সংঘের কর্তাদের উত্তর, ‘সঠিক৷ আপনাদের সঙ্গে আমাদের মিল রয়েছে৷ দুটি সংগঠনই ক্যাডার পরিচালিত৷ কিন্তু তফাতটা হল, সিপিসি কাজ করে রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে৷ সংঘ কাজ করে মানুষের মধ্যে থেকে৷ রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে থেকে নয়৷’ কথোপকথনের মধ্যেই পরিষ্কার, রাষ্ট্রশক্তিকে এড়িয়ে চলতে চেয়েছে সংঘ৷ সংগঠন তৈরিতে আদর্শগত মূল্যবোধকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ততটাই অগ্রাহ্য করা হয়েছে রাজনীতিকে৷ মনে করে হয়েছে, রাষ্ট্রশক্তিতে মূল্যবোধের অবনমন হবে৷ ‘বড়-মানুষ’ তৈরি করার একটি সংগঠন হিসেবেই থেকে যেতে চেয়েছে সংঘ৷

তবে গত ৪০ বছরে পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে৷ তৃতীয় সরসংঘচালক বালাসাহেব দত্তাত্রেয় দেওরাস নতুন চেতনা নিয়ে এসেছিলেন৷ রাজনীতিই মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে পারে, তা বুঝতে শুরু করে সংঘ ৷ সংঘের রাজনৈতিক মুখ হিসেবে উঠে আসে বিজেপি বা ভারতীয় জনতা পার্টি৷ একই সঙ্গে গত চার দশক ভারতীয় রাজনীতিতে একের পর এক নজির সৃষ্টি করে চলেছে সংঘের এই রাজনৈতিক মুখ৷

সংঘের রাজনৈতিক মতাদর্শই যে বিজেপি’র চলার পথ, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক৷ অতীতে অটলবিহারি বাজপেয়ি এবং লালকৃষ্ণ আদবানির মতো নেতাদের রাস্তাই নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি৷ মোদি সরকারের পদক্ষেপের মধ্যেও সংঘের কার্যনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে৷ এক সময়, বালাসাহেব দত্তাত্রেয় দেওরাস যে রাজনৈতিক চেতনার প্রসার ঘটিয়েছিলেন, তা এখন দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল৷ জাতীয় রাজনীতিতে তাল মেলাতে সংঘের রাজনৈতিক আদর্শকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি মোদি সরকার৷ সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিজেপির সংসদীয় দলের এম পি’দের জনতার সঙ্গে ‘টিফিন মিটিং’ করতে বলেছিলেন মোদী৷ বিষয়টা ভেবে দেখার মতো৷ সংঘের প্রভাব এতে স্পষ্ট৷ ‘সেহ-ভোজ’ বা Common Dinning সংঘেরই একটি জনসংযোগ কর্মসূচি ৷ বিজেপির এমপি, এমএলএ-রা শহর বা গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি দুপুরে বা রাতের খাবার খেয়ে দলীয় প্রচার সারছেন, এই দৃশ্য সংবাদ মাধ্যমে অনেকবার দেখা গিয়েছে৷

বিজেপির বিস্তারক নীতিতেও সংঘের কার্যপদ্ধতি রয়েছে৷ সর্বভারতীয় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের মস্তিস্কপ্রসূত এই কর্মসূচীতে, বিস্তারকরা নিজের জেলার বাইরে, বাড়ি থেকে দূরে অন্য জেলায় গিয়ে দলের প্রচার করেন৷ ২০১৯ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিস্তারক কর্মসূচির সাহায্যেই বাজিমাৎ করতে চাইছে বিজেপি৷ যেমন, পশ্চিমবঙ্গের বিস্তারকরা দলের প্রাথমিক লক্ষ পূরণে এগিয়ে চলেছেন ৷ রাজ্যে শেষ দুটি নির্বাচনে না জিতলেও দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে বিজেপি৷ নিজের বাড়ি থেকেই বিস্তারকরা কাজ করতে পারেন৷ সংগঠনের সম্পাদকদের নিজের রিপোর্ট জমা দেন৷ অন্তত ১৫ দিন থেকে এক বছর থাকে তাদের কার্যকাল৷ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সংঘের প্রচারকদের অন্যরুপ বিস্তারক৷ প্রচারকরা সংঘ ও বিজেপির মধ্যে যোগাযাগ রক্ষা করতেন৷ পরবর্তিকালে তাঁরাই রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির সাংগঠনিক সম্পাদকের কাজ করেছেন৷

তবে সময় অনেকটাই বদলেছে৷ এতটাই বদলেছে যে, বিজেপির সঙ্গে সমানতালে নিজেদের কর্মসূচির প্রচারে পাল্লা দিয়েছে সংঘ৷ সম্প্রতি প্রচার-অপ্রিয় সংঘ মিরাট এবং গুয়াহাটির সভাগুলির প্রবল ভাবে প্রচার করেছে৷ মোদী জামানায় দেশের প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যেতে চাইছে সংঘ৷ সংঘের আদর্শ প্রচারে এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত মনে করছেন RSS কর্তারা৷ যাঁরা সংঘের আদর্শ প্রচার করেন তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, সে যুগে মিডিয়া এতটা প্রভাবশালী ছিল না৷ লক্ষ লোকের সভা করেছে সংঘ৷ কিন্তু মানুষ জানতে পারেনি৷ এখন সময়ের সাথে মিডিয়াও বদলেছে৷ সংঘের প্রতি মানুষের টান দেশের প্রত্যেকটি কোনায় পৌঁছে দিতে পারে মিডিয়া৷