দেবময় ঘোষ, কলকাতা: লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে বাম-কংগ্রেস আসন সমঝোতার প্রশ্নে বামফ্রন্ট স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত৷ কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রশ্নে আরএসপি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের আপত্তি আছে৷ আসন সমঝোতার প্রশ্নে সিপিএমের বৃহৎ অংশ অনেক আগে থেকেই এককদম পা বাড়িয়েই ছিল৷ সম্প্রতি, সীতারাম ইয়েচুরি-রাহুল গান্ধী বৈঠক সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মনবল বাড়িয়েছে৷ তবে শুরুতে আপত্তি থাকলেও বিজেপি তৃণমূল ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করতে সিপিআইয়ের পশ্চিমবঙ্গ কমিটিও আসন সমঝোতার পক্ষে৷

অন্যদিকে, কংগ্রসের সঙ্গে সমঝোতা করে বামফ্রন্টের কী উপকার হয়েছে – এই প্রশ্ন তুলে আরএসপি-ফরওয়ার্ড ব্লক৷ পার্টি সূত্রে খবর, প্রকাশ্যে না বললেও সমঝোতার বিপক্ষেই সুর চড়িয়েছে এই দুই বাম শরিক৷ যদিও বামফ্রন্টগতভাবে কোনও বৈঠক বা সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি৷ তবে সমঝোতার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ আরএসপি’র যেমন স্পষ্ট বক্তব্য, বাম ভোটের কাঁধে ভর করে কংগ্রেস এখন রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দল৷ কংগ্রেসের ভোট তো বামেদের দিকে আসে না৷ ‘কং-জনতা’বামেদের ভোট দেয় না৷ দরকার পড়লে সেই ভোট যায় তৃণমূলে৷ বামেদের ‘পকেট ভোট’কংগ্রেস দিকে ওই ভুল সমঝোতার ফলে চলে গিয়ছে৷

আরএসপি’এর এক বর্ষীয়ান নেতার কথায়, ‘‘সিপিএমের ভিতরেও ওই আসন সমঝোতা নিয়ে বিতর্ক চলছে বলেই জানি৷ জাতীয়স্তরে হয়তো ওদের সমাধানসূত্র বের হবে৷ আমরা এই সমঝোতার বিরোধী৷ এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে একদিন দেখা যাবে বামফ্রন্টকে জোট নিয়ে মমতার (বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গেও বসতে হচ্ছে …! এটা সত্যি সমঝোতা নিয়ে ফ্রন্টে ইনার কন্ট্রাডিকশন (অন্তর্দ্বন্দ্ব) রয়েছে৷ কংগ্রেস থেকে ভোট ট্রান্সফার হয়ে বামফ্রন্টের দিকে আসেনি৷ কিন্তু বাম ভোটের কাঁধে চড়ে কংগ্রেস এখন বিধানসভায় বিরোধী দল৷ সূর্যকান্ত মিশ্রও হেরে গিয়েছেন৷’’

খোলাখুলি কিছু না বললেও ফরওয়ার্ড ব্লক যে সমঝোতা বিরোধী তা অনেক আগেই স্পষ্ট করেছে ব্লক নেতৃত্ব৷ এক সময় রাজ্যের ব্লক নেতৃত্ব বলেছিল, দরকার হলে ৪২টি আসনেই একক ভাবে লড়াই করবে দল৷ তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নয় ব্লক৷ এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘অনেক কিছু বলার আছে৷ তবে এখন কিছু নয়৷ ২৫ ফেব্রুয়ারির পর বলব৷’’ তবে সূত্র বলছে, ব্লকের অন্দরে আলোচনা জোরদার, ‘‘কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে বামদলগুলির কী লাভ হয়েছে? কংগ্রেসের ভোট বাকি দলগুলির দিকে আসেনি৷ তা চলে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে৷ নিশ্চিত বামফ্রন্টের ভোটও কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে৷ ধ্বসে গিয়েছে বাম দলগুলির ভোট ব্যাংক৷

যে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আলোচনা হয়েছে তা এসেছে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে৷ ওই নির্বাচনে সিপিএম ১৯.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ সিপিএই ১.৫ শতাংশ, আরএসপি ১.৭ শতাংশ এবং ফরওয়ার্ড ব্লক ২.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ এক সিনিয়ার বামফ্রন্ট নেতার বক্তব্য, ‘‘মহেশতলা উপনির্বাচন দেখলেন তো! যদি কংগ্রেসের ভোট সিপিএম পেত, তবে পার্টি তৃতীয় স্থানে বসে থাকতো না৷ এটা লজ্জার বিষয়৷’’

কিন্তু সমঝোতা নিয়ে সিপিআইয়ের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘‘২০১৬ ফের হওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই৷ বামফ্রন্টগত ভাবে আলোচনা করেই জোট হবে৷ বিজেপি-তৃণমূলকে আটকাতে বাম-কং জোট ভাগাভাগি হলে চলবে না৷ আসন বণ্টন আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়৷ তবে প্রদেশ কংগ্রেসের থেকে কোনও সদর্থক বার্তা তো আসুক৷ তা তো আসেই নি …৷’’সূর্যকান্ত মিশ্র এক সময় বলেছিলেন, ‘‘Maximised Polling Against BJP and TMC ৷ বিজেপিকে হারাতে যেখানে সিপিএম থাকবে না সেখানে কংগ্রেসকে সমর্থন করতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷’’আপাতত সূর্যের আলোতেই আলোকিত হতে চাইছে সিপিএমের সিংহভাগ৷ কিন্তু অনেকে এও বলছে – পঞ্চায়েত নির্বাচনে মাত্র একটি (উত্তর দিনাজপুর) জেলা পরিষদ আসন পেয়েছে বামফ্রন্ট৷ কংগ্রেস পেয়েছে ৬টি৷ সন্ত্রাসের আবহেও এই পরিসংখ্যান ভোলার নয়৷