সুমন ভট্টাচার্য: পামেলা গোস্বামী আর রিয়া চক্রবর্তী। দু’জনেই ড্রাগ কান্ডে অভিযুক্ত। কিন্তু দু’জনকে কি এক চোখে দেখা হচ্ছে? কঙ্গনা রানাওয়াত কি কলকাতা থেকে ধৃত এই প্রাক্তন বিমান সেবিকা তথা মডেলকে নিয়ে কোনও ট্যুইট যুদ্ধ শুরু করেছেন?

রিয়া চক্রবর্তীর সময় যেভাবে বিভিন্ন ন্যাশনাল টেলিভিশন চ্যানেল এই বাঙালি নায়িকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাঁর প্রতিটি ব্যক্তিগত কথোপকথনকে প্রকাশ্যে আনা হচ্ছিল, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অলিখিত যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল, পামেলা গোস্বামীর গ্রেফতারি এবং তিনি কোন্ কোন্ রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাই নিয়ে কি চর্চা হচ্ছে? ভারতীয় মিডিয়ার এই ‘ডিফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট’ বা ‘সিলেক্টিভ মেমোরি’ আসলে অনেক কিছু প্রশ্ন তুলে দেয়। তাহলে কি আলাদা আলাদা ব্যক্তি হলে আমরা আলাদা আলাদা ধরণের প্রতিক্রিয়া জানাই? আমরা যাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ট্রোল’ বা নেট দুনিয়ায় আলোড়ন বলি, তার পিছনেও কি কোনও উদ্দেশ্য থাকে?

আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি এবং বিভিন্ন সময় উত্তর সম্পাদকীয়তে লিখেওছি যে কেউ যদি ড্রাগ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে থাকে বা জড়িত হওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাঁকে মহৎ বা মহীয়সী সাজানোর কোনও দরকার নেই। আইন আইনের মতো করে বিচার করবে। সেই কারণেই রিয়া চক্রবর্তীই হোক বা দীপিকা পাড়ুকন, কারও বিরুদ্ধে যদি নির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাঁকে তদন্তের মুখোমুখি হতেই হবে। রিয়া চক্রবর্তী কোন্ ক্যপশন লেখা টি-শার্ট পরে গিয়েছিলেন, এবং তাতে নারীবাদের কোন্ ঝলক দেখা যাচ্ছিল, তা বিচার্য বিষয় হতে পারে না।

কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে আমাদের ‘সিলেকশন’ বা বেছে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে। যে সব চ্যানেল এবং তাদের সদা উত্তেজিত তারকা অ্যাঙ্কাররা সেই সময় গলার শিরা ফুলিয়ে রিয়া চক্রবর্তীর ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বা টেলিভিশন স্টুডিওতে বসেই ‘কোর্ট মার্শাল’ করে দিচ্ছিলেন, তাঁরা এখন কোথায়? একটি নামী সংবাদ সংস্থার এক তরুণ সাংবাদিক যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পামেলা গোস্বামীর গ্রেফতারি এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে ন্যাশনাল মিডিয়ার নিরুত্তাপ থাকাকে কটাক্ষ করেন, তখন তার সঙ্গে সহমত না হয়ে উপায় থাকে না। এখন তো কেউ ড্রাগ, ড্রাগ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা তাতে কতটা জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, তাই নিয়ে ‘প্রাইম টাইম শো’ করছেন না।

তৃণমুল শিবির ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করে দিয়েছে, পামেলার সঙ্গে বিজেপির ‘হাই প্রোফাইল’ নেতাদের যে রকম ছবি দেখা গিয়েছে, তা যদি অন্য কোনও দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতা’র কোনও তথাকথিত ‘প্রমাণ’ দেখা যেত, তা হলে এতদিনে কি হতো? পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বক্তব্য, গেরুয়া শিবির তো তাহলে এই ‘ড্রাগ কান্ড’র সঙ্গে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ বা ‘জাতীয় নিরাপত্তা কতটা বিপন্ন’, এই সব প্রশ্ন তুলে বাজার গরম করে দিত। ঠিক যেমন সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পরে বিহার নির্বাচনের আগে রিয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। কঙ্গণা রানাওয়াত নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে মাদক ব্যবহারের দায়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেগে দিয়েছিলেন। এখন কেন পামেলা গোস্বামীর গ্রেফতারি এবং এই ‘ড্রাগ কান্ড’এর তদন্তের দাবি নিয়ে কেউ সোচ্চার নন?

এই যে ‘ডিফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট’ বা আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে আলাদা আলাদা তুলাদন্ডে মাপা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ভাবতে বাধ্য করে আসলে কি একই দেশে অভিন্ন আইন শুধুই রাজনৈতিক স্লোগান, না, সেটা সত্যি সত্যি দেশে চালু করা প্রয়োজন বলে রাজনৈতিক দলগুলি মনে করে? ভারতবর্ষ যেহেতু নিজেকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ বলে প্রমাণ করতে চায় এবং এখনও পর্যন্ত ভারতের সব রাজনৈতিক দলই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে, তাই গণতন্ত্রই আমাদের জন্য সবথেকে জরুরি শব্দ। এবং গণতন্ত্রে রিয়া চক্রবর্তী এবং পামেলা গোস্বামী, দু’জনেই একই অভিযোগে অভিযুক্ত। তাহলে দু’জনের জন্য আলাদা আলাদা মানদন্ড কেন? একজনের সঙ্গে দেশের শাসক দলের নেতাদের ছবি পাওয়া গিয়েছে বলে?

আমেরিকা যদি বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী গণতন্ত্র হয়, তাহলে ভারত বিশ্বের সব থেকে বড় গণতন্ত্র। এবং সংবাদ মাধ্যম তার চতুর্থ স্তম্ভ। অনেকেই মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অতি দক্ষিণপন্থী নেতা মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় সঙ্কট ডেকে এনেছেন। যার পরিনতি ছিল মার্কিন কংগ্রেস ভবন বা ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা। ট্রাম্পের ‘প্রভাব’এ খোদ মার্কিন মুলুকের কিছু দক্ষিণপন্থী মিডিয়াও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সংশয় তৈরি করেছিল। এই সবটাই আসলে বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। আমেরিকা তার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

রিয়া চক্রবর্তী এবং পামেলা গোস্বামী, দু’জনেই ঘটনাচক্রে বাঙালি। দু’জনের সঙ্গেই অভিনয় জগতের একটা যোগাযোগ রয়েছে। দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এক হলে সংবাদ মাধ্যম যদি আলাদা ভাবে দেখে, তাহলে আমাদের গণতন্ত্র কতটা মজবুত হবে?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.