মানব গুহ, কলকাতা: ‘‘মানুষই দেবতা গড়ে তাহারই কৃপার পরে করে দেব মহিমা নির্ভর’’৷ কবির ভাষায় মানুষই দেবতা গড়ে৷ কিন্তু মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবতারাই মানুষ গড়েন৷ ‘দেব’ রাই মানুষ গড়েন, দেবদের আর্শীর্বাদেই মানুষের উত্থান হয়৷ আবার সেই দেবগণের কোপদৃষ্টিতে পড়লে মানুষের পতন হতেও বেশি সময় লাগে না৷ প্রবাদবাক্য কি মিথ্যা হতে পারে? হয়ও নি৷ ঠিক যেমন সিপিএম বহিষ্কৃত সাংসদ ঋতব্রতের ক্ষেত্রে হয়েছে৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: ধর্ষণের মামলা দায়ের হল ঋতব্রতর বিরুদ্ধে

সবটাই যেন ‘দেব’ কৃপা৷ দেবদের আশীর্বাদ না থাকলে কি এত তাড়াতাড়ি এত উঁচুতে দেবতার আসনে বসা যায়? ঠিক এটাই কিন্তু ঘটেছে সিপিএম বহিষ্কৃত সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে৷ সিপিএমের ৪ দেবের আশীর্বাদেই চমকপ্রদ উত্থান এই প্রাক্তন সিপিএম তরুণ তুর্কির৷ রবীন দেব, গৌতম দেব, নেপাল দেব ও সবশেষে বুদ্ধদেব৷ দেবদের আশীর্বাদের হাত মাথায় থাকলে আর কী চাই৷ দেবদের কৃপাদৃষ্টি পেয়েই নিজের রাজনৈতিক জীবনে অভাবনীয় চমক পেয়েছিলেন ঋতব্রত৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসে অভিযুক্ত ঋতব্রত

এস.এফ.আইয়ের সাধারণ সম্পাদক দিয়েই ক্ষমতার বৃত্তে প্রবেশ৷ শুরুর দিকেই নজরে পড়লেন এক দেবের৷ ব্যাস, উত্থান শুরু৷ রবীন দেবের আশীর্বাদ নিয়ে সিপিএমে যাত্রা শুরু ঋতব্রতের৷ এক দেবের আশীর্বাদপ্রাপ্ত শিষ্যকে দেখে নিজের আশীর্বাদের হাতও বাড়িয়ে দিলেন আরেক দেব৷ এবার নেপাল দেবের কৃপাদৃষ্টি পেলেন সিপিএমের তৎকালীন উঠতি ছাত্রনেতা৷ জীবনে উন্নতির গ্রাফ তড়তড়িয়ে উঠতে থাকল৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: চুম্বন বিতর্কে বহিষ্কৃত সিপিএম সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

দেবদের আশীর্বাদ পাওয়া আরও বাকি ছিল৷ রবীন, নেপাল এই দুই দেবের পর ঋতব্রতে সদয় হলেন আর এক দেব৷ এবার প্রবাদ প্রতিম গৌতম দেব৷ দাপুটে গৌতম দেবের নজরে পড়তেই যেন চারচাঁদ লাগলো ঋতব্রতের রাজনৈতিক জীবনে৷ সাদামাটা ছাত্রনেতা থেকে সিপিএমের অলিন্দে প্রবেশ এই ৩ দেবের হাত ধরেই৷

আরও বাকি ছিল৷ ৩ দেবের কৃপাদৃষ্টি পেয়ে সিপিএমের ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের পর তার প্রতি সদয় হলেন সর্বশেষ দেব৷ ৩ দেবেরও ‘‘দেবাদিবেদ’’৷ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব৷ ব্যাস, আর কি দরকার৷ ৪ দেবের কৃপায় একঝটকায় ছাত্র নেতা থেকে সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য৷ তারপর, আলিমুদ্দিন থেকে বিনাবাধায় সোজা পৌঁছে গেলেন সংসদেও৷ ৪ দেবের আশীর্বাদে একেবারে দেশের গণতন্ত্রের মন্দিরে ঢুকে পড়লেন ঋতব্রত৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: ঋতব্রত প্রশ্নে সিদ্ধান্তে গড়িমসি কেন? বিতর্ক সিপিএমের অন্দরেই

২০১৪ থেকে ২০১৭, মাত্র ৩ বছর৷ এই ৩ বছরেই উদ্দাম জীবন৷ ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবার অভিযোগ উঠল বারবার৷ বাম লড়াইয়ের আদর্শ থেকে সরে ভোগবাদী জীবনে প্রবেশ৷ ঋতব্রতকে নিয়ে ৪ দেবের কাছে বারবার অভিযোগ করেছিলেন প্রাক্তন সিপিএম নেতা রেজ্জাক মোল্লা৷ সিপিএমের মিছিলে মদের বোতল নিয়েও হাঁটার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে৷ তবে, ‘দেব অনুগ্রহে’ পরিপুষ্ঠ সাংসদ ‘কারণবারি’ নিয়ে হাঁটবেন এটা কারও ধারণার মধ্যে ছিল না৷ দামী পেন, ঘড়ি, ইলেকট্রনিক্স গেজেট ব্যবহার, সব কথাই সিপিএমের দেবদের কানে যেতে থাকল৷ যদিও সংসদে ঋতব্রতের পারফরম্যান্স সবকিছুকে চাপা দিয়েই রেখেছিল৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: ঋতব্রতকে ছেঁটে ফেলে কি বুদ্ধ লবিকে কড়া বার্তা আলিমুদ্দিনের?

কিন্তু দেবতাদের কৃপা আবার সারাজীবন থাকে না৷ দেবতাদের খুশি রাখতে না পারলেই কৃপাদৃষ্টি থেকে কোপদৃষ্টিতে পড়তে বেশি সময় লাগে না৷ আর পাপ করলে কিন্তু দেবতারা রুষ্টই হন৷ সাংসদ হবার পরই ধরাকে সড়া জ্ঞান করা শুরু করলেন ঋতব্রত৷ ‘দেবাদিদেবের’ আশীর্বাদ পেয়ে যাওয়ায় বাকি দেবদের পাত্তাই দিতেন না তরুণ সিপিএম নেতা৷ বুদ্ধদেবের কৃপাদৃষ্টি পড়তেই যাঁর হাত ধরে সিপিএমে বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছিল সেই প্রথম দেব অর্থাৎ রবীন দেবকেই অস্বীকার করা শুরু করলেন ঋতব্রত৷ কথাবার্তায় অপমানও করে ফেলেছিলেন রবীন দেবকেই৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: সিআইডি’র পর ঋতব্রত’র বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের মামলা

আর তারপর থেকেই পতনের শুরু৷ এক দেবের কোপদৃষ্টিতে পড়ে ও নিজের জীবনের চালচলনের জন্য খুব দ্রুত তার গ্রাফ পড়তে শুরু করল৷ তবে রবীন দেব কুপিত হলেও তখনও তার মাথায় ছিল বাকি তিন দেবের হাত৷ তবে, আলিমুদ্দিনে ঋতব্রতের বিরুদ্ধে একের পর এক মহিলাঘটিত অভিযোগ জমা হতে থাকায় অচিরেই স্বয়ং ‘দেবাদিদেব’ তাঁর আশীর্বাদের হাত গুটিয়ে নিলেন৷ নিজের শিষ্যের প্রতি তিতিবিরক্ত বুদ্ধদেব তাঁর সমর্থনের হাত সরিয়ে নেওয়াতেই পতন অনিবার্য হয়ে যায় ঋতব্রতের৷

তবে, তখনও ঋতব্রতকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচাতে তৎপর ছিলেন বাকি দুই দেব৷ গৌতম দেব ও নেপাল দেব৷ তাই, ঋতব্রতের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গঠিত মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে ৩ সদস্য কমিটির সুপারিশেও তাকে শাস্তি দেয়নি সিপিএম৷

তবে শেষ পর্যন্ত সমস্ত তদন্ত রিপোর্ট পড়ে ঋতব্রতের মাথা থেকে তাঁর সমর্থনের হাত সরিয়ে নিলেন সিপিএমের ‘দেবাদিদেব’৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ যাঁর লবির, যাঁর পছন্দের নেতা হওয়াতেই ঋতব্রতের এত বাড়বাড়ন্ত সেই বুদ্ধদেব নিজের সমর্থন সরিয়ে নেওয়াতেই পতন অনিবার্য হয়ে যায় ঋতব্রতের৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: বিজেপিতে ঋতব্রত? জল্পনায় ফুটছে আলিমুদ্দিন

তারপরেও দুই দেব, গৌতম দেব আর নেপাল দেব চেষ্টা করেছিলেন শেষ পর্যন্ত৷ কিন্তু বাকি দুই দেব নিজেদের সমর্থন সরিয়ে নেওয়ায় মহম্মদ সেলিমের রিপোর্ট অনুযায়ী ঋতব্রতকে বহিষ্কার করা ছাড়া কোনও রাস্তাই ছিল না সিপিএমের কাছে৷ বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বসে দলের বিরুদ্ধে কথা বলাটা তো একটা শেষ উপলক্ষ মাত্র৷ দেবদের কোপে পড়ায় ঋতব্রতের বাঁচার কোনও রাস্তাই ছিল না৷

স্বর্গের দেবতাদের হাতে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়েছিল৷ মর্তের দেবদের হাতে যে দেবতা না হয়ে ‘ফ্রাঙ্কেনস্ট্রাইন’ হবে এটা মনে হয় কারোর ভাবনার মধ্যে ছিল না৷ দেবতাদের হাতে সৃষ্টি হয়েছিল দেবী৷ আর মানুষ দেবদের হাতে কী সৃষ্টি হয়েছে, তা দেখছেন বাংলার মানুষ৷ সৃষ্টিকর্তাদেরও মনে হয় যোগ্যতা লাগে সৃষ্টি করার বিষয়ে৷ তা না হলেই বিপদ৷ যেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বাংলা রাজনীতির দেবরা৷

ঋতব্রত সংক্রান্ত আরও: সরকারি খরচে রাজার হালে সর্বহারার সাংসদ ঋতব্রত

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ