বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: কর্মসংস্থানের জন্য সেভাবে সুযোগ তৈরি হয়নি নন্দীগ্রামে৷ যে কারণে, এখানকার আন্দোলনের সূতিকাগার এক নম্বর ব্লকের ১০-১২ থেকে শুরু করে ৫৫-৬০-৬৫ বছর বয়সিদেরও দলে দলে কাজের জন্য দিনের পর দিন বাইরে থাকতে হচ্ছে৷ আর, তারই জেরে বিশেষ করে তরুণ-যুবকদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা যেমন দেখা দিয়েছে৷ তেমনই, ডেঙ্গির জীবাণুও পৌঁছে যাচ্ছে এখন নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সূতিকাগারে৷

একই সঙ্গে নন্দীগ্রামে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিউবারকিউলোসিস (এমডিআর টিবি)-এর বিষয়টিও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে৷ এই সব বিষয়ে যেমন ওয়াকিবহাল রয়েছেন রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা৷ তেমনই, একই সঙ্গে তাঁরা যথেষ্ট আতঙ্ক এবং উদ্বেগেও রয়েছেন৷ এ দিকে, নন্দীগ্রামের মানুষ কেমিক্যাল হাব এবং বিশেষ করে স্পেশাল ইকোনমিক জোন (SEZ)-এর বিরোধিতা করলেও, সেখানকার ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’ প্রথম থেকেই শিল্পের পক্ষে রয়েছে বলে জানিয়েছে৷ অথচ, সরকার গঠনের জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে নন্দীগ্রামের আন্দোলন অন্যতম ভূমিকা পালন করলেও, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অভাবে সেখানকার বহু শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ-যুবক, বয়স্ক এমনকী প্রবীণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিই এখন সংকটে৷

- Advertisement -

রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘নন্দীগ্রামের বহু তরুণ-যুবক কাজের জন্য দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থাকেন৷ এই ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, বাড়ির বাইরের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য অনেকেই এইচআইভি-র শিকার হয়ে পড়েছেন৷’’ রাজ্যের কোনও স্থানে হোক অথবা দেশ কিংবা বিদেশের কোনও প্রান্তে, দিনের পর দিন যাঁরা জীবিকা অর্জনের জন্য বাড়ির বাইরে থাকেন, স্বাস্থ্য দফতরের তরফে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়৷ স্বাস্থ্য দফতরের এই আধিকারিক বলেন, ‘‘নন্দীগ্রামের যে সব মানুষ দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থেকে কাজ করেন, তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হয়েছে৷ রিপোর্ট পেলেই বোঝা যাবে পরিস্থিতি এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে৷ তবে, এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা আমরা উড়িয়ে দিতে পারছি না৷’’

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবরেটরি) না থাকার জন্য নন্দীগ্রামের ওই সব মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ শুরু করতে দেরি হয়ে গিয়েছে৷ নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সূতিকাগার এখানকার এক নম্বর ব্লকেরও যে সব শিশু-কিশোর, যুবক-তরুণ, বয়স্ক এবং প্রবীণকে দিনের পর দিন বাইরে থেকে জীবিকা অর্জন করতে হয়, তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্প্রতি শুরু হয়েছে৷ তবে, শুধুমাত্র এইচআইভি নয়৷ নন্দীগ্রামে ডেঙ্গির সংক্রমণও স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের আতঙ্ক এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে৷ রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘ডেঙ্গির সংক্রমণ সাধারণত শহরাঞ্চলে ঘটে৷ কিন্তু, নন্দীগ্রামে ডেঙ্গি আক্রান্তের হার যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘নন্দীগ্রামে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যাটা হয়তো তেমন উদ্বেগের নয়৷ তবে, এখানকার ডেঙ্গি আক্রান্তের হার যথেষ্ট উদ্বেগের৷ কারণ, ডেঙ্গি বৃদ্ধির এই হার এখানে কোথাও ৩০০, কোথাও আবার ৪০০ শতাংশ৷ কেন এ ভাবে ডেঙ্গি আক্রান্তের হার বেড়ে গেল, সেটাই আমাদের ভাবাচ্ছে৷’’

সূত্রের খবর, স্বাস্থ্য দফতরের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অনেকেই এমন মনে করছেন যে, কর্মসংস্থানের জন্য দিনের পর দিন বিভিন্ন শহরাঞ্চলে থাকেন যে সব শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক, বয়স্ক এবং প্রবীণ, তাঁদের মাধ্যমেই ডেঙ্গির জীবাণু পৌঁছে যাচ্ছে এখন নন্দীগ্রামে৷ কারণ, সাধারণত জীবিকা অর্জনের জন্য শহরাঞ্চলে থাকার সময় কেউ না কেউ ডেঙ্গি-র শিকার হয়ে পড়তেই পারেন৷ এর পর সুস্থ হওয়ার আগে তিনি যখন বাড়িতে ফিরে গেলেন, তখন তাঁর মাধ্যমেই ডেঙ্গির জীবাণুও পৌঁছে যাচ্ছে নন্দীগ্রামে৷ ‘নন্দীগ্রাম ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র অফিস সম্পাদক ভবানীপ্রসাদ দাসের কথায়, ‘‘এখানে আর কাজের সুযোগ কোথায়৷ ২০১১-র পরে নতুন করে সেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা হয়নি৷ তাই, কাজের জন্য কলকাতা, দিল্লি, নাগপুর, মুম্বই, গুজরাতের মিরাট এবং দুবাইতেও যেতে হচ্ছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘কাজের জন্য ১০-১২, ১৫-১৬ বছরের স্কুলছুট ছেলে থেকে শুরু করে ৫৫-৬০-৬৫ বছর বয়সিদেরও বাইরে যেতে হচ্ছে৷ সেখানেই দিনের পর দিন থাকতে হচ্ছে৷’’

তবে, শুধুমাত্র আবার এইচআইভি এবং ডেঙ্গির বিষয়ও নয়৷ নন্দীগ্রামে এমডিআর টিবি-র বিষয়টিও স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে৷ কেন? স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘ঠিক মতো ওষুধ না খাওয়া, মাঝ পথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া, এমনই বিভিন্ন কারণে টিবি এখানে আরও বেশি এমডিআর হয়ে উঠছে৷ এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য দফতরের নজরদারির অভাবও রয়েছে৷’’ তবে, একই সঙ্গে তিনি অবশ্য জানিয়েছেন, এমডিআর টিবি-র বিষয়টি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তার জন্য রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের প্রচেষ্টা জারি রয়েছে৷