স্বরলিপি দাশগুপ্ত- বাংলা ছবির ভিত্তিপ্রস্তর বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দিল ‘পাসওয়ার্ড’। সাইবার ক্রাইম, ডার্ক নেট নিয়ে এই প্রথম বাংলায় এমন ছবির সাক্ষী থাকল দর্শক। সমস্ত রকমের তথ্য কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্ত ডার্ক নেটের সহায় হাতের মুঠোয় চলে আসছে অপরাধীদের। তাই এই সাই-ফাই ছবিতে তাই বার বার উঠে আসে ক্রিপ্টো ক্রাইম, এথিকাল হ্যাকিং-এর মতো জটিল কিছু বিষয়। অতএব পপকর্ন খেতে খেতে বা সঙ্গীর হাতে হাত রেখে ছবি দেখতে গেলে তা বোধগম্য হতে বেশ অসুবিধা হতে পারে। ছবির প্রতিটি দৃশ্যে তাই নিরেট মনোনিবেশ প্রয়োজন।

ছবির টান টান দৃশ্য, টুইস্ট, গ্ল্যামারে ভরা রহস্য দেখলে অবশ্য খুব একটা মনোযোগ হারানোর সম্ভাবনাও নেই। ছবির শুরু হয় ডার্ক নেট কতটা ভয়ঙ্কর তেমনই একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে। এক উঠতি মডেল তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের দৃশ্য ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। এর পরে ভয়ঙ্কর পরিণতি হয় তার। দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে কে এমন করল, কীভাবে এমন করল। এই দৃশ্যটি নিয়েই বেশ কৌতুহল তৈরি হয়। কিন্তু তার পরেই গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে যেখানে আন্তর্জাতির সাইবার সন্ত্রাসই মূল বিষয়। যেখানে কোডিং, ডিকোডিং, হ্যাকিং, বিভিন্ন রকমের প্রযুক্তির ব্যবহার দেখানো হয়। প্রতিটি বিষয়ই বেশ ফাঁক ফোঁকরহীন ভাবে দক্ষতার সঙ্গে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে ডার্ক নেট কতটা খারাপ প্রভাব ফেলে এবং তা রুখতে কী কী করণীয় এইগুলি নিয়ে ধোঁয়াসা থেকে যায়। অথবা বলা ভাল, প্রথম দৃশ্যে দেখানো তরুণীর গল্পটির সঙ্গে সেভাবে যোগ পাওয়া যায় না।

সাইবার সন্ত্রাস দল অনিয়ন-এর প্রধান ইসমালভ (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)। সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য ভারতকেই বেছে নেয় সে। কিন্তু তার মূল নিশানা যদিও ভারত নয়। কিন্তু ভারতের মাটিকে বেছে নেওয়ার পিছনে রয়েছে তার বিশেষ কারণ। প্রতিশোধস্পৃহা। ইসমালভের স্ত্রী মেরিয়াম (পাওলি দাম) তার এই প্রতিশোধস্পৃহার সফরসঙ্গী। অনিয়ন সন্ত্রাস দলের প্রতিপক্ষ রোহিত দাশগুপ্ত (দেব)। সাইবার সেলের প্রধান।

অন্যদিকে রয়েছে বিদেশ থেকে আসা ইঞ্জিনিয়ার নিশা চট্টোপাধ্যায় (রুক্মিণী মৈত্র), যে দেশে ফিরেই মাদকাসক্তদের ডেরায় গিয়ে ওঠে। সেখানেই দেখা যায় তার সঙ্গী আদিকে (আদৃত রায়)। ধোঁয়া আর নিয়ন আলোয় ঘেরা রেভ পার্টিতে নাচতে দেখা যায় আদি আর নিশাকে। রুক্মিণী ও আদির রসায়ন এবং রুক্মিণীর নাচ এখানে চোখে পড়ার মতো। এমন রেভ পার্টির দৃশ্য বাংলা ছবিতে নতুন। কিন্তু খটকা লাগে অন্য জায়গায়। গানের দৃশ্যে দুজনকে কড়া মাদকে বুঁদ হয়ে থাকতে দেখা গেলেও, পুলিশের জালে ধরা পড়ার পরে তাঁদের আসক্তি আর ফিরে আসতে দেখা গেল না একবারও।

তবে বলতেই হয় ছবিটির প্রতিটি দৃশ্য বার বার বুঝিয়ে দেয় বাংলা ছবি স্মার্ট হচ্ছে। সম্পর্ক, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, কিংবা নাচ-গানে ভরা প্রেম কাহিনী এসব ছাড়াও বাংলা ছবি হতে পারে, তা বুঝিয়ে দিল কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই ছবি। এমন একটি আনকোরা বিষয়কে বেছে নেওয়ার জন্যই কুর্নিশ জানাতে হয় কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও দেবকে।

অভিনয়ের প্রসঙ্গ আসলে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামটাই প্রথমে উঠে আসে। বাঙালি প্রেমিকের ভূমিকায় তাঁকে দেখে অভ্যস্ত দর্শক। কিন্তু এই ছবিতে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি তিনি বাঙালি। পরমব্রতর উর্দু উচ্চারণ, সুরমা চোখের স্থির দৃষ্টি দেখে পর্দা থেকে চোখ সরানো যায় না। পর্দায় ইসমালভকে দেখালেই আবহে বাজতে থাকে মধ্যপ্রাচ্যের ধুন। তাই বার বার অপেক্ষা করতে হয় নীতিবোধে বলিষ্ঠ টেররিস্ট ইসমালভকে আবার কখন দেখা যাবে পর্দায়। পাওলিও তাঁর চরিত্রে সব সমযের মতোই একেবারে যথাযথ। দেবও পুলিশ আধিকারিকের চরিত্রে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর অভিনয়গুলি দেখে মনে হয় রোহিত দাশগুপ্ত চরিত্রটি তাঁর জন্যই তৈরি। পর্দায় রুক্মিণীর স্মার্ট অ্যাপিয়ারেন্স সত্যিই চোখে পড়ার মতো। অ্যাকশন দৃশ্যে সাবলীল তিনি। কিন্তু রেগে যাওয়ার দৃশ্যগুলিতে রুক্মিণীর অভিনয়ে কিছুটা খামতি দেখা যায়। আদির চরিত্রে আদৃতকে সত্যিই চোখে পড়ে। একদিকে সে লাভার বয়, কিন্তু ভিতরে বাসা বেঁধে রয়েছে এক খলনায়ক। দুটি সত্ত্বাকে যে ভাবে তিনি আদৃত ফুটিয়ে তুলেছেন তা প্রশংসনীয়। এছাড়াও পার্শ্ব চরিত্রেও অভিনেতারা মানানসই।

কিন্তু সাইবার সেলের প্রধান মাদক চক্রের অপরাধীদের ধরেই দেশের এথিকাল হ্যাকিং-এর কাজে নিয়ে নেয় এটায় একটু খটকা লাগে। রোহিত ও নিশার রসায়নও আর একটু পরিষ্কার করে বুঝতে পারলে ভাল হতো। তবে ছবির বড় প্রশংসনীয় বিষয় হল, গল্পে সুবিচার, মূল্যবোধের থেকে জাতীয়তাবাদকে বড় করে দেখানো হয়নি।

অভীক মুখোপাধ্যায়ের সিনেমাটোগ্রাফি ও রবিরঞ্জন মৈত্রের সম্পাদনা টানটান। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও যথাযথ। অহেতুক কোনও গান ব্যবহার করা হয়নি। তবে বাংলা ছবিতে সাই ফাই জ্যঁর-এর ভিত গড়ল পাসওয়ার্ড। বলা ভাল, বেশ ভাল ভাবেই গড়ল। বিনোদনের জন্য দেখতে গেলেও এই ছবি মন দিয়ে না দেখলে টিকিটের টাকা নষ্ট। ছবির শেষটা দেখে মনে হয় এর সিকোয়েলও হতে পারে। সব শেষে বলা ভাল, এই পরিচালক-প্রযোজক জুটি-সহ পুরো বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রিরই দায়িত্ব আরও অনেকটা বেড়ে গেল।