মা দুর্গার আশীর্বাদ থেকে ভক্তেরা বঞ্চিত হন না৷ এর সব থেকে বড় প্রমাণ মেলে রানাঘাটের হিজুলির গাঙ্গুলি বাড়ির পুজোর ইতিহাস ঘাটলে৷

দীর্ঘ এই সময়ে গাঙ্গুলিদের অবস্থার উত্থান পতন ঘটেছে কিন্তু হাজারো অভাব অনটনেও মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো বন্ধ হয়নি৷ এমনকী শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়- হিজুলির এই গাঙ্গুলি বাড়ি তিরিশের দশকে একবার বিক্রি হলেও বছর ঘুরে আর একটা দুর্গা পুজো আসার আগেই বেহাত হওয়া বাড়ি ফিরে এসেছিল গাঙ্গুলিদের হাতেই৷ একমাত্র মা দুর্গার কৃপাতেই এমনটা ঘটেছিল বলে মনে করেন এই পরিবারের মানুষেরা৷

এখন রানাঘাট সংলগ্ন হিজুলি গ্রামটিতে গেলে অনেক দুর্গাপুজো চোখে পড়তে পারে৷ কিন্তু ১৯০৩ সালে যখন গাঙ্গুলি বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু হয় তখন ওই গ্রামে আর কোনও পুজো হত না৷ ওই সময় পরিবারের চার কর্তা গণেশ, রাখালদাশ, ননীগোপাল এবং লক্ষ্মীনারায়ণ৷ এদের মধ্যে গণেশ এবং লক্ষ্মীনারায়ণের ভাগে পড়েছিল হিজুলির বাড়ি৷

অন্য ভাইরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করে অন্যত্র চলে যায়৷ তখন গণেশ এবং লক্ষ্মীনারায়ণ হিজুলির বসত বাড়ির পুজোর দালানে এইপুজো শুরু করেন৷এই দুই ভায়ের পরবর্তী বংশধরেরা এখন পুজো চালাচ্ছেন৷ তবে এই পুজো কবে থেকে শুরু তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে৷ পরিবারের কোনও কোনও শরিকের দাবি এই পুজো পৌঁনে দু’শো বছরের প্রাচীন৷

পুজো শুরু হলেও ১৯৩৬ সালে প্রবল আর্থিক অনটনের মুখে পড়ে গাঙ্গুলিরা৷ সেই বছর দুর্গা পুজোর পর বসতবাড়ি নিলাম করে বিক্রি করতে বাধ্য হয় এই বাড়ির সদস্যরা৷ তখন সেই বাড়ি কিনে নেন তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ডাক্তার হরিচরণ ঘোষ৷ ওই বাড়ি গাঙ্গুলিদের হাতছাড়া হতে গ্রামের সকলের কাছে তখন বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে দুর্গা পুজোর কি হবে৷ তারপরেই মিরাকেল ঘটে যায়৷ টাকা জোগাড় হল, হরিচরণ ডাক্তারও রাজি হলেন যে দামে কিনেছিলেন সেই দামেই বাড়ি ফিরিয়ে দিতে ৷ ১৯৩৭ সালের পুজোর কয়েকদিন আগেই বসতবাড়ি ফিরে পেল গাঙ্গুলিরা৷ এমন ঘটনা নাস্তিকদের কাছে কাকতালিয় মনে হতে পারে৷ কিন্তু ওই বাড়ির সদস্যরা আজও বিশ্বাস করেন মা দুর্গার আশীর্বাদেই সেদিন বাড়ি ফিরে পাওয়া গিয়েছিল৷

পারিবারিক এই পুজোয় এখনও আটচালার ঠাকুর হয়৷ দশমীতে বিসর্জন৷ চূর্ণী নদীতে গাঙ্গুলিদের দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় ধ্বনি ওঠে – আসছে বছর আবার এসো মা৷ তারপর সেই ভেসে যাওয়া প্রতিমায় থাকা ওই পাটাতন কেটে আলাদা করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পালা৷ কারণ ওই পাটাতনের উপরই আবার যে আসছে বছর প্রতিমা গড়ে উঠবে – মা দুর্গা আসবেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে৷ আর তারই জন্য নন্দ উৎসবের দিন গাঙ্গুলি বাড়ির পুজোর দালানে পরিবারের কুল পুরোহিতকে বসতে হবে পাটে সিঁদুর উপলক্ষ্যে পুজোয়৷ তারপর চলে মূর্তি গডার কাজ৷

একটা সময় ছিল যখন হিজুলিতে বিজলি বাতি ছিল না অথচ গাঙ্গুলিদের বাড়িতে ডায়নামো দিয়ে আলো জ্বলত৷ পরিবারের রমরমার দিনে গোটা গ্রাম খেত পুজো উপলক্ষ্যে৷ এখন অবশ্য সেই জৌলুশ নেই তবে এই পুজোই পারিবারিক বন্ধন অটুট রেখেছে৷ কর্মসূত্রে যে যেখানেই থাকুক না কেন পুজোর দিনে গ্রামের বাড়িতে ফেরা চাই আর তাদের জমায়েতে পুজোর দালান ভরে ওঠে৷ এই বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব হল সপ্তমী থেকে নবমী তিনদিনেই মৎস ভোগ দেওয়া হয়৷ তিনদিনই বলি দেওয়া হয় চালকুমড়ো, আখ, কলা৷ নিয়মানুসারে বাড়ির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার নামে হয় পুজোর সংকল্প৷