পূজা মণ্ডল, কলকাতা: সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গিয়েছে অধ্যাপক হেনস্থার ঘটনা। ঘটনা প্রসঙ্গ বুধবার মুখ খুললেন রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে উঠলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। সেই সঙ্গেই তাঁরা সন্ধান দিয়েছেন সমাধানের পথ।

সকলেই বলেছেন, ‘সংরক্ষিত আসন’ থেকে কোন শিক্ষক এসেছেন মানেই সেই শিক্ষক ‘মধ্যমেধা’ সম্পন্ন এই ধারণা সবার আগে দূর করতে হবে। ‘সংরক্ষিত আসন’ থেকে শিক্ষাঙ্গনে পড়াতে যেসব শিক্ষকরা আসেন তাঁদের যোগ্যতার কোন খামতি নেই। সবার আগে প্রয়োজন এই সচেতনতার বিষয়টি আত্মস্থ করে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। তবেই শিক্ষাঙ্গনে এসে নিম্ন বর্গের শিক্ষকদের হেনস্থা হতে হবে না। শুনতে হবে না যে, ‘সংরক্ষণ কোটায় চাকরি পেয়ে পড়াতে এসেছে।’

পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে উঠল SSK-MSK শিক্ষকদের ধর্না

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের অধ্যাপক মনোজিত মণ্ডল kolkata 24×7 কে বলেন, ‘‘অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। আমি আমার নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতার কথা ইতিমধ্যেই ফেসবুকে পোস্ট করেছি। যাদবপুরেও একই ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছে। একজন ছাত্রী আমায় অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করেছিল। আমার নাম না নিয়ে বললেও তো বোঝা যায় কাকে বলা হচ্ছে! কাজেই এটা পশ্চিম বাংলায় ভীষণভাবে আছে। আমি নিজে দলিত হয়ে ভয়ঙ্করভাবে এই বিষয়টির মুখোমুখি হয়েছি। আমাকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মামলা করতে হয়েছিল এসসি-এসটি আইনে। শিক্ষকদের যে দমিয়ে রাখা হয় সেটা সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কম-বেশি আছে। ঘটনাচক্রে আমি রবীন্দ্র ভারতীতে ৪ বছর পড়িয়েছি। এখন যাদবপুরে পড়াচ্ছি। দুটো বিশ্ববিদ্যালয়েই এই বিষয়টি আছে। আমি যাদবপুরে এখনও এটা ভোগ করছি। নিশ্চুপভাবে শিক্ষকরা এই বিষয়টি মানতে বাধ্য হন। সংরক্ষিত আসন থেকে এসেছে শুনেই সেই শিক্ষকদের বাঁকা নজরে দেখা হয়। এই সমস্যাটাকে মেটানো উচিৎ। এটার মধ্যে কোন রাজনীতির প্রসঙ্গ নেই। এই সমস্যা সমাজের উচ্চ বর্ণের মানুষদের সঙ্গে নিম্ন বর্গের মানুষদের।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রানীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক তথা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি টিচার্স এ্যাসোসিয়েশনের(CUTA) সাধারণ সম্পাদক পার্থিব বসু বলেন,‘‘ভয়ঙ্কর। মেনে নেওয়া যাচ্ছে না বিষয়টা। এরা দুর্বৃত্ত। এরা কি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি জানি না। এদের বিরুদ্ধে উদাহরণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। আর সবার আগে এই বিষয়ে সচেতনতা আনা দরকার। এই সংরক্ষণের বিষয়টার ঐতিহাসিক পটভূমিকা রয়েছে। কিছু মানুষকে হঠাৎ সুবিধাভোগী করে হঠাৎ কিছু পাইয়ে দেওয়ার বিষয় এটা নয়। সংরক্ষণ অমূলকভাবে শুরু হয় নি। যারা সংরক্ষণের মাধ্যমে চাকরি পান তাঁরা যে সবাই অযোগ্য এটা মনে করার কোন কারণ নেই।’’

পড়ুন: এনআরএস কাণ্ডের জের, সরানো হল হাসপাতালের আউটপোস্টের ওসিকে

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক কল্যাণ কুমার দাস বলেন, ‘‘রবীন্দ্রভারতীতে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। যারা সংরক্ষিত আসনে চাকরি পান তাঁদের সর্ব ক্ষেত্রেই এই ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁদের বিষয়ে সাধারণ ধারণা থাকে যে তাঁরা অতটা মেধাবী নন। কিন্তু মেধার সংজ্ঞায় এই রকম ধারণা রাখা উচিৎ নয়। এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

কিছু জনগোষ্ঠীর মানুষকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার জন্যই এই সংরক্ষণ, এটা বেশিরভাগ মানুষই ভুলে যান। আমার গবেষণার বিষয় ছিল ‘৯০ সালের পরবর্তী ক্ষেত্রে দলিত সাহিত্যের নানা আন্দোলনমূলক দিক।’ সেই কারণে আমার মনে হয়, এই বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচার হওয়াটা আশু প্রয়োজন। আমার সহকর্মীর সঙ্গেও এই ঘটনা ঘটেছিল। এই বিষয়টি প্রেসিডেন্সিতেও ছিল এবং আছে।’’ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ পাখিরা বলেন, ‘‘সংরক্ষণের বিষয়টি সংবিধান স্বীকৃত। সুতরাং কেউ যদি মনে করেন এই কোটায় চাকরি পাওয়া শিক্ষকরা অযোগ্য, তবে সরাসরি সেই আঘাত সংবিধানের উপর লাগে।’’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সরস্বতী কেরকেটাকে জাত তুলে হেনস্থা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ জানাজানি হতেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। একসঙ্গে পদত্যাগপত্র জমা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন বিভাগীয় প্রধান। ঘটনার শিকার শিক্ষকদের অধিকাংশের সন্দেহ, তাঁদের হেনস্থার পিছনে কাজ করেছে জাতিগত বিদ্বেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে টালবাহানা করেন বলে দাবি করে সরব হন শিক্ষকদের একটি বড় অংশ। কালো ব্যাজ পরে উপাচার্যের দপ্তরে যান তাঁরা। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে ক্যাম্পাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড-পোস্টার হাতেও প্রতিবাদ জানান। উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী কারও পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। যদিও তৃণমূল ছাত্র পরিষদ এই ঘটনায় অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পড়ুন: শহরে অনুষ্ঠিত হল বিদ্বজনদের প্রতিবাদ সভা

ঘটনার তদন্তে গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের ইস্তফা না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। সেই সঙ্গেই জানান শিক্ষা দফতর কোন অবস্থাতেই এই ধরণের অভিযোগ বরদাস্ত করতে পারে না। ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে কোনও রকম ভুল বোঝাবুঝি চলতে পারে না। শিক্ষকদের অপমান মেনে নেওয়া যায় না। উপাচার্য এ বিষয়ে কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটি চলতি সমস্যার দ্রুত নিস্পত্তি করুক। রিপোর্ট পেশ করুক। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা যেন উচ্চে তোলা হয়।’’

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এই ঘটনার পরবর্তী পথ নির্দেশ করে দেবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে খোদ সমাজের কান্দারীদের সঙ্গে ঘটমান এই ঘটনা কি সমাজের লজ্জা নয়! বিষয়টা বড্ড ভাবায়!