বিশেষ প্রতিবেদন, পুরুলিয়া: টেলিফোনের অপরপ্রান্তে বরফঢাকা দেশ থেকে ছেলে মাকে আশ্বস্ত করেছিল, ‘‘চিন্তা করো না৷ জন্মদিনের আগেই আমি বাড়ি ফিরছি৷’’

মায়ের কথা রাখতে হয়তো সময়ের আগেই বাড়ি ফিরছে ছেলে৷ তবে জীবিত নয়, কফিন বন্দি হয়ে! আন্টার্টিকাতে সুমেরু অভিযানে গিয়ে তরুণ বাঙালি গবেষকের মৃ্ত্যুতে স্বভাবতই শোকের ছায়া নেমে এসেছে পাহাড়ে জঙ্গলে ঘেরা পুরুলিয়া শহরে৷

আরও পড়ুন: বাবুলের মুখে ‘রকের ভাষা’ শুনেছেন পার্থ

পুলিশ সূত্রের খবর, মৃত গবেষকের নাম- শুভজিৎ সেন(২৪)৷ বাড়ি পুরুলিয়া শহরের নডিহা-ডুলমির ভুঁইয়া পাড়ায়৷ পরিবার সূত্রের খবর, ১৬ এপ্রিল শুভজিতের জন্মদিন৷ তার আগেই তাঁর বাড়ি ফেরার কথা ছিল৷ কারণ, ২০ এপ্রিল জেঠতুতো দাদা ও ২৬ এপ্রিল তাঁর নিজের দাদা শুভঙ্করের বিয়ে রয়েছে৷ ইতিমধ্যে সেন পরিবারে দুই ছেলের বিয়েকে ঘিরে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল৷ সেন পরিবারের ছোটছেলের মৃত্যু সংবাদে এক লহমায় খুশি উবে ঘন হয়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া৷

ছোট থেকেই মাটির প্রতি প্রবল টান ছিল শুভজিতের৷ মাটির তলার বিষয় নিয়ে তাঁর আগ্রহের শেষ ছিল না৷ সেই সূত্রেই পুরুলিয়া জে কে কলেজ থেকে ভূতত্ত্ব নিয়ে স্নাতক করার পর ওডিশার ভুবনেশ্বর আইআইটি থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি৷ ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর আন্টার্টিকা হোসেন রির্সাচে’ আন্টার্টিকাতে সুমেরু অভিযানের আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি৷ ছাড়পত্র মেলে৷ গত বছরের ১৯ অক্টোবর সারা দেশের ৩৬ জন গবেষকের সঙ্গে তিনি সুমেরু অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন৷

আরও পড়ুন: BREAKING: ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পে সুনামির আশঙ্কা

বরফে ঢাকা আন্টার্টিকার হিমবাহের প্রকৃতির ওপরই গবেষণা করেছিলেন তিনি৷ সংশ্লিষ্ট সংস্থা সূত্রে সেন পরিবারকে জানানো হয়েছে, সেখানে গবেষণা করাকালীন ‘কনভয় অপারেশনে’ গুরুতর জখম হয়েছিলেন শুভজিৎ৷ চিকিৎসা চলছিল তুষারে ঢাকা মৈত্রী ক্যাম্পে৷ সোমবার রাতে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়৷ মঙ্গলবার সকালে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেলেও প্রথমে বাবা-মাকে জানানোর সাহস পাননি দাদা শুভঙ্কর৷ কারণ, বাবা-মা দু’জনেই অসুস্থ৷ বুধবার অবশ্য তিনি বিষয়টি সামনে আনতে বাধ্য হন৷ কারণ, ইতিমধ্যেই ভাইয়ের কফিন বন্দি দেহ রওনা হয়েছে বরফে ঢাকা দেশ থেকে পাহাড়ে-জঙ্গলে ঢাকা শহরের উদ্দেশে৷

‘কনভয় অপারেশন’টা কেমন? সুদুর আন্টার্টিকা থেকে টেলিফোনে রিসার্চ সংস্থার এক সদস্য বলেলেন, ‘‘বরফের চাঁইয়ের ওপর বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানকার হিমবাহের প্রকৃতিতে নিরক্ষণ করা, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে প্রকৃতির বিভিন্ন রুপ খতিয়ে দেখাকেই বলা হয় কনভয় অপারেশন৷ একেকটি বরফের চাঁইয়ের ওপর থাকেন একেকজন গবেষক৷ সেখান থেকে ফেরার পথেই পা পিছলে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন শুভজিৎ৷ গুরুতর জখম হয়৷ আমাদের মৈত্রী বেস ক্যাম্পে ওর চিকিৎসাও চলছিল৷ কিন্তু সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে সোমবার রাতে ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে৷’’

আরও পড়ুন: অ্যাডমিট কেলেঙ্কারিতে বিপাকে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

শুভঙ্কর বলছেন, ‘‘ভাই খুবই প্রতিভাবান ছিল৷ ওর মৃত্যুটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না৷ বাবা-মা’কে কি বলে সান্তনা দেব, তাও বুঝে উঠতে পারছি না৷’’ ক’দিন বাদেই সেন পরিবারে বিয়ের সানাই বাজার কথা৷ চলছিল তারই প্রস্তুতি৷ সেখানে এখন শোকের ছায়া৷ সবাই প্রতীক্ষায়- কখন ফিরবে, বাড়ির ছোটছেলের কফিন বন্দী দেহ! কথা বলার ভাষা হারিয়েছেন শুভজিতের বাবা-মা৷ বারে বারেই মূর্চ্ছা যাচ্ছেন তাঁরা৷ মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরলে ঝরছে বুক ফাটানো মাতৃ আর্তনাদ- ‘‘এভাবে কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলি! কি নিয়ে বাঁচবো বল!’’

আরও পড়ুন: যাত্রীদের ব্যাগ নিখোঁজকে কেন্দ্র করে তুলকালাম বিমানবন্দরে