শিবশঙ্কর আদক,কলকাতা: তখন তিনি সেনাবাহিনীতে৷ সারা দিন ডিউটি করে সন্ধ্যা নামার পর চাঁদের আলোতে অনুশীলন করতেন৷ সে যুগে হকি মাঠে ফ্লাড লাইটের প্রচলন শুরু হয়নি৷ চাঁদের আলোতে অনুশীলন করতেন বলেই বোধ হয় তাঁকে বলা হতো ধ্যানচাঁদ৷ হকির সর্বকালের সেরাদের একজন, যাঁর স্পর্শে হকি স্টিক হয়ে যেত জাদুকরের লাঠি, সেই হকির জাদুকর ধ্যানচাঁদের জন্মদিন আজ৷

আরও পড়ুন:জন্মদিনে ধ্যানচাঁদের প্রতি শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর

হকির জাদুকর নামে কিন্তু হকি স্টিকে হাত দিয়েছিলেন অনেক বড় বয়সে৷ ১৬ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরই হকি স্টিকে হাতে নেন তিনি৷ যে খেলাটি তিনি এত পরে শুরু করেছিলেন, সেই খেলাতেই তাঁর উত্থান হতে থাকে অবিশ্বাস্য গতিতে৷ রেজিমেন্টের দল থেকে জাতীয় দলে উঠে আসতে সময়ও লাগেনি খুব বেশি৷ ১৯২৮ সালের অলিম্পিকের জন্য সম্ভাব্য সেরা হকি খেলোয়াড় বাছাই করার জন্য একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়৷ ধ্যান চাঁদ উত্তর প্রদেশের হয়ে খেলার সুযোগ পান৷ প্রথম ম্যাচ থেকেই তার জাদু দেখাতে শুরু করেন তিনি৷ দুর্দান্ত গতি ও স্কিলে সবাইকে চমকে দেন! জায়গা পেয়ে যান জাতীয় দলে৷ সেখান থেকে সোজা হল্যান্ডের আমস্টারডামে অলিম্পিকে৷ রূপকথার মতোই শুরু, কেরিয়ারের বাকি পথও ছিল রূপকথার মতোই৷

আরও পড়ুন: ধ্যানচাঁদের প্রথম ভারতরত্ন পাওয়া উচিৎ ছিল: মিলখা সিং

আমস্টারডাম অলিম্পিকে ১৪টি গোল করে ভারতকে সোনা এনে দেন ধ্যানচাঁদ৷ অলিম্পিকে সেটাই ছিল ভারতের প্রথম স্বর্ণপদক৷ টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর কোনও একটি পত্রিকায় লেখা হয়, ‘হকি শুধু খেলাই নয়, এটি যেন ম্যাজিক৷ আর ধ্যানচাঁদ হকির একমাত্র জাদুকর৷’ পুরো টুর্নামেন্টে ভারত কোনও গোল হজম করেনি, এটিও অনন্য রেকর্ড ৷১৯৩২ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকেও সোনা জেতে ভারত৷

আরও পড়ুন: হকি নয়, কুস্তি ছিল তাঁর প্রথম পছন্দ! কেনই-বা নাম হল ধ্যানচাঁদ?

১৯৩৬ অলিম্পিকে আসর বসে বার্লিনে৷ ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় আয়োজক জার্মানি৷ অলিম্পিক স্টেডিয়ামে সেদিন খেলা দেখতে হাজির হন হিটলার স্বয়ং৷ ফ্যুয়েরারের সামনেই জার্মানদের গুনে গুনে আট গোল দেয় ভারত৷ একাই ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন ধ্যানচাঁদ৷ একাই ছয় গোল করেন তিনি৷ চাঁদের খেলা দেখে হিটলারও তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন৷ তিনি ধ্যানচাঁদকে করেন,‘ আপনি যখন হকি খেলেন না, তখন কী করেন?

ধ্যানচাঁদ – আমি দেশের সেনাবাহিনীতে কাজ করি৷

হিটলার – কোন পদে আছেন আপনি ?

ধ্যানচাঁদ – আমি ল্যান্সনায়েক৷

হিটলার – জার্মানিতে চলে আসুন, আমি আপনাকে ফিল্ড মার্শালের পদ দেব৷

এরপর কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে যান ধ্যানচাঁদ৷ কী জবাব দেবেন কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিলেন না৷ অবশেষে তিনিই নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘ভারতই আমার দেশ৷ আমি ওখানেই বেশ ভালো আছি৷’জবাবে হিটলার বলেছিলেন,‘আপনি যেটা ভালো মনে করবেন, সেটাই করবেন৷’

আরও পড়ুন: ধ্যান চাঁদ হতে পারেন রনবীর

১৯৪৮ সালে তিনি শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন৷আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে তার গোলের সংখ্যা চারশোরও বেশি৷ ৫১ বছর বয়সে সেনাবাহিনী থেকে অবসরগ্রহণকালে মেজর পদে ছিলেন তিনি৷ ১৯৫৬ ভারত সরকার তঁকে পদ্মভূষণ উপাধি সম্মানিত করে৷

আরও পড়ুন: সচিনের জন্যই বাদ ধ্যানচাঁদ

আজ হকির জাদুকর কিংবদন্তি ধ্যানচাঁদের জন্মদিন ১১২তম জন্মবার্ষিকি৷ ২৯ আগস্ট দিনটি ভারতে প্রতিবছরই ‘ক্রীড়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়৷তাঁর গোল করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্যই বিশ্ব হকিতে ভারত একদা প্রভাব বিস্তার করেছিল৷ তাই ভারতের সর্বকালের হকি খেলোয়াড়ের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা কলকাতা ২৪x৭ পক্ষ থেকে৷