প্রসেনজিৎ চৌধুরী: সময় চলে যায়৷ স্মৃতি ফিকে হয়৷ উৎসবের দিন এলে চোখের কোনা একটু ভিজে যায় বইকি৷ চলছে উৎসব-সৌভ্রাতৃত্বের ঈদে মেতে উঠেছে বাংলাদেশ৷ এমনই উৎসবের দিনে কিশোরগঞ্জের ভৌমিক পরিবারে নেমে আসে দুঃখ- ঝর্না রানী নেই৷ তিন বছর আগের জঙ্গি হামলায় গুলি লেগে মৃত্যু হয় তাঁর৷ সেদিনও ঈদ ছিল৷ সেই থেকে উৎসবের আনন্দ এখানেই এসে হোঁচট খেয়ে পড়ছে৷

ঈদ মানেই আনন্দ৷ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও ঈদ পালন করেন উৎসবের আবহে৷ আর কিশোরগঞ্জের কথাই আলাদা৷ এখানেই বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহে লক্ষাধিক মানুষের নমাজ পাঠ এশিয়ার বৃহত্তম৷ শুধু বাংলাদেশই নন, প্রতিবেশী ভারত থেকে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেকে আসেন শোলাকিয়ায়৷ জনসমাগমে গমগম করে ঈদগাহ৷

২০১৬ সালের ৭ জুলাই৷ রক্তাক্ত ঈদের দিন৷ কয়েকদিন আগেই রমজান চলাকালীন ঢাকায় হয়ে গিয়েছে ভয়াবহ গুলশন জঙ্গি হমালা৷ বিখ্যাত হোলি আর্টিজান ক্যাফের ভিতর ঢুকে ইফতারের সময় বিদেশি ও গ্রাহকদের নির্বিচারে খুনের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছিল বিশ্ব৷ বিরাট জঙ্গি দমন অভিযানে জঙ্গিদের খতম করা হয়৷ জারি হয় প্রবল সতর্কতা৷ বাংলাদেশে এত বড় জঙ্গি হামলা আগে হয়নি৷ গুলশন হামলার পরে ছড়িয়েছিল প্রবল ভয়৷ সেই ভয়-আতঙ্ক নিয়েই ৭ তারিখ পালিত হয়েছিল ঈদ৷

সেদিন জঙ্গিদের টার্গেট ছিল বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহ৷ সরাসরি জঙ্গিরা গ্রেনেড ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়৷ বিস্ফোরণ গুলি চালানোর ঘটনায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক৷ পরপর দুটি জঙ্গি হানার ঘটনায় তখন প্রবল ত্রস্ত বাংলাদেশ৷ পুলিশি নিরাপত্তা, চেকপোস্ট পার হয়ে জঙ্গিদের হামলা ও তাদের রুখতে গিয়ে পুলিশের গুলি চালনা-কাউন্টার লড়াই ও বারুদের গন্ধে ভরে গিয়েছে শোলাকিয়া৷ এলাকাবাসী প্রাণভয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছেন৷ হামলাকারী একজনকে ঘটনাস্থলেই খতম করে ফেলে রক্ষীরা৷ একজন ধরা পড়ে৷ দুই রক্ষীর মৃত্যুও হয়৷

জঙ্গি ও ব়্যাব বাহিনীর মধ্যে গুলির লড়াইয়ের মাঝে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে৷ স্থানীয় বাসিন্দা ঝর্না রানী ভৌমিক প্রতিবারের মতো সেবারও বাড়ির সামনে সেমাই নিয়ে প্রতিবেশীদের আপ্যায়নে হাজির ছিলেন৷ তাঁর তৈরি সেমাই ও সরবতের কদর রয়েছে এলাকায়৷ প্রতিবারই ঈদের অনেকে নমাজ পাঠ করে ফেরার সময় ঝর্নাদেবীর হাতে তৈরি মিষ্টি খান৷ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন৷ সেদিনও সেইসবই হওয়ার কথা৷ কিন্তু জঙ্গি হামলায় পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল৷ গুলির শব্দ শুনে ভয়ে ঝর্নাদেবী ঘরের ভিতর চলে গিয়েছিলেন৷

নিয়তি পিছু ছাড়েনি৷ জানালা দিয়ে ছুটে এসেছিল গুলি৷ ঘরের ভিতরেই গুলি লেগে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যান তিনি৷ বাইরে প্রবল আতঙ্ক৷ প্রকাশ্যে চলছিল নিরাপত্তারক্ষী ও জঙ্গিদের মধ্যে গুলির লড়াই৷ ভিতরে রক্তাক্ত ঝর্ণাদেবীকে ধরে রেখে জীবন মৃত্যুর মাঝে উৎকণ্ঠার প্রহর পার করছিলেন বাকিরা৷ যখন অভিযান সমাপ্ত হল-ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে ঝর্না রানী ভৌমিকের৷

শোলাকিয়া জঙ্গি হামলার তিন বছর হয়ে গেল৷ নিরাপত্তার কড়া বলয়ে ঘেরা এই ঈদগাহে এবারেও লক্ষাধিক মানুষ নমাজ পাঠ করেছেন৷ শুভেচ্ছা বিনিময় হচ্ছে৷ ঈদ এলেই আগে ভৌমিক পরিবার জুড়ে থাকত ব্যস্ততা৷ অতিথি আপ্যায়নের সবকিছু দেখাশোনা করতেন ঝর্নাদেবী৷ তিনিই নেই৷ ভৌমিক পরিবারে তাই ঈদও নেই৷ একটা রাস্তা হয়েছে এলাকায়-‘শহীদ ঝর্ণা রানী সড়ক’৷ সেই রাস্তা ধরেই বহু মানুষ আনন্দের উৎসবে অংশ নিতে যান৷ প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়েই এখন ঈদের দিনে চোখের কোণটা ভিজে ওঠে ঝর্নার পরিবারের সদস্যদের৷