আজাদ হিন্দ ফৌজ সুভাষচন্দ্র গঠন করেননি, করেছিলেন রাসবিহারী বসু৷ রাসবিহারী বসু ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের এক অজেয় বীর বিপ্লবী৷ তিনিই ভারতের বাইরে জাপানে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী পরিবর্তনের অনুষ্ঠানে গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর বোমা হামলার কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি৷ পরবর্তী কালে বাঘা যতীনের একনিষ্ঠ অনুগামী হিসাবে এবং তাঁরই নির্দেশে রাসবিহারী এবং এমএন রায় ছদ্মবেশে বিদেশে যান এবং অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে ভারতে বিপ্লব শুরু করার জন্য দুঃসাহসিক তৎপরতা চালান৷

সুভাষচন্দ্রের অনেক আগেই ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়িয়ে রাসবিহারী বসু, এমএন রায়, অবনী মুখোপাধ্যায় এবং বীরেন চট্টোপাধ্যায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন৷ রাসবিহারী ১৯২৩ সালে জাপানে চলে যান৷

রাসবিহারী বসুর তৎপরতায় জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতের জাতীয়তাবাদীদের পাশে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন যোগায়। ১৯৪২ সালের ২৮-২৯ মার্চ টোকিওতে তাঁর ডাকে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। তখন ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে রাসবিহারী সেই সম্মেলনে একটি সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেন। ১৯৪২ সালের ২২ জুন ব্যাংককে তিনি লিগের দ্বিতীয় সম্মেলন আহ্বান করেন।

সেই সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র বসুর লিগে যোগদান ও রাসবিহারীর সভাপতিত্বে দায়িত্ব গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেসব ভারতীয় সেনা মালয় ও বার্মা ফ্রন্টে জাপানিদের হাতে আটক হয়েছিল তাঁদের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ ও লিগের সশস্ত্র শাখা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে যোগদানে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু দুভার্গক্রমে জাপানি সেনা কর্তৃপক্ষের একটি পদক্ষেপে রাসবিহারীর প্রকৃত ক্ষমতায় উত্তরণ ও সাফল্য ব্যাহত হয়। রাসবিহারী বসু ও তাঁর সেনাপতি মোহন সিংকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির নেতৃত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কিন্তু তিনি সরলেও তাঁর সাংগঠনিক কাঠামোটি রয়ে যায়। রাসবিহারী বসুর প্রারম্ভিক সাংগঠনিক শ্রমের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আজাদ হিন্দ ফৌজ নামেও পরিচিত) গঠন করেন। মৃত্যুর পূর্বে রাসবিহারী বসুকে জাপান সরকার সম্মানসূচক ‘সেকেন্ড অর্ডার অব দি মেরিট অব দি রাইজিং সান’ খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি জাপানে রাসবিহারী বসুর মৃত্যু হয়।

রাসবিহারী বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখোপাধ্যায় এবং বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীদের অমর করে রেখে গিয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷ তাঁর ‘পথের দাবি’ উপন্যাস এই বিপ্লবীদের ছায়ায় তৈরি ৷ এমনটাই শোনা যায় পথের দাবির সব্যসাচী চরিত্রটি রাসবিহারী বসুকে মনে রেখেই গড়া৷