চিকিৎসক অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গোবিন্দ ঘোষ৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: ভেলোর থেকে ফিরে এসেছিলেন রোগী৷ কারণ, অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক দেরিতে সময় দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসকরা৷ অথচ, অস্ত্রোপচারে দেরি হলে রোগীর প্রাণহানির আশঙ্কাও ছিল৷

শুধুমাত্র তাই নয়৷ ওই রোগীর মস্তিষ্কের এমন স্থানে ছিল টিউমার, যেখানে অস্ত্রোপচার করা এমনিতেই যেমন যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দক্ষ কোনও চিকিৎসকের কাছেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়৷ তেমনই, বিপজ্জনক অবস্থানে থাকার কারণে, এই ধরনের টিউমার অস্ত্রোপচারও রোগীর পক্ষে আশঙ্কার৷ তবে, শেষ পর্যন্ত অবশ্য কলকাতার বেসরকারি এক হাসপাতালে ওই রোগীর প্রাণ রক্ষা হয়েছে৷ অস্ত্রোপচারের পরে হাসপাতাল থেকে তিনি বাড়িও ফিরে গিয়েছেন৷ এবং, তিনি এখন সুস্থও রয়েছেন৷ আর, এ ভাবেও বিরল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে নজির গড়ে সফল হলেন ওই বেসরকারি হাসপাতালের স্নায়ু-শল্য চিকিৎসক অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়৷

হাবড়ার বাসিন্দা বছর ৪৫-এর ওই রোগীর নাম গোবিন্দ ঘোষ৷ তাঁর কথায়, ‘‘আমি নতুন জীবন পেলাম৷ এখন আবার আমি কাজ করতে পারব৷ আমার দুই মেয়ের পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারব৷’’ একই সঙ্গে অবশ্য তাঁর আক্ষেপ, ‘‘আমার মতো গরিব মানুষকেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হল৷ তার জন্য ধার-দেনা করে টাকা জোগাড় করতে হয়েছে৷ অথচ, সরকারি স্বাস্থ্য বিমার কার্ড কাজে লাগল না৷’’ মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা, আর তার সঙ্গে কোনও কোনও সময় বমি বমি ভাবের সমস্যা বাড়তে থাকায়, প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলেন তিনি৷ তবে, গত বছর যখন রোগনির্ণয়ের পরে তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর মস্তিষ্কের বড় মাপের টিউমার অস্ত্রোপচার না করালে তিনি সুস্থ হবেন না, তখন ভেলোরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

উল্টোডাঙার কাছে ইএম বাইপাসের ধারে অবস্থিত বেসরকারি ওই হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট নিউরোসার্জন অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘গোবিন্দ ঘোষকে যখন আমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর শরীরের বাম দিক অসাড় হয়ে গিয়েছিল৷ অস্ত্রোপচারের পর তিনি এখন সুস্থ রয়েছেন৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘তবে, এই ধরনের বিপজ্জনক অবস্থানে থাকা কোনও টিউমারে অস্ত্রোপচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়৷ এবং, অস্ত্রোপচার করাও যথেষ্ট কঠিন বিষয়৷’’ কেন? অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘গোবিন্দ ঘোষের মাথায় যেখানে টিউমারটি ছিল, সেই স্থানটি ফ্লোর অফ দ্য ব্রেন৷ মস্তিষ্কের এই ধরনের অবস্থানে কোনও টিউমার থাকলে, অস্ত্রোপচারের জন্য সেখানে পৌঁছনোই কঠিন হয়ে পড়ে৷’’ তবে, শেষ পর্যন্ত সাফল্য মিলেছে৷ গত ২৯ এপ্রিল গোবিন্দ ঘোষের মস্তিষ্কের ওই বিপজ্জনক অবস্থানে থাকা বড় মাপের টিউমারটি ছ’ ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচারের পর বের করা হয়েছে৷

অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এই অস্ত্রোপচারের সময় বেশি পরিমাণে রক্তক্ষরণ এড়ানো এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার থেকে রক্ষা করাও সম্ভব হয়েছে৷ কলকাতায় এই ধরনের কোনও টিউমারে অস্ত্রোপচার আগে হয়েছে কি না, আমার জানা নেই৷’’ এমনই বিভিন্ন কারণে গোবিন্দ ঘোষের মস্তিষ্কের টিউমারে অস্ত্রোপচারের বিষয়টি বিরল হিসেবে নজির গড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা৷ তাঁরা জানিয়েছেন, মস্তিষ্কের এমন বিপজ্জনক অবস্থানে থাকা কোনও টিউমারে অস্ত্রোপচারের জন্য কলকাতায় তেমন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দক্ষ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে৷ যে কারণে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন এই ধরনের অস্ত্রোপচারে সাফল্য আসেনি৷ তেমনই আবার, অসম্পূর্ণ অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল থেকে ছুটিও দেওয়া হয়েছে৷ তবে, এ ক্ষেত্রে সাফল্য মিলেছে৷ এ দিকে, মে মাস, ব্রেন টিউমারের বিষয়ে সচেতনতার মাস৷ সেই কারণে, অনির্বানদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও এখন অত্যন্ত খুশি৷ কারণ, কলকাতায় তিনি এমন বিরল চিকিৎসার নজির গড়তে পারলেন৷

_______________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) কানহাইয়া-মুক্তমনাদের জন্য কলকাতায় প্রতিবাদী-রবি
(০২) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’
(০৩) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(০৪) মমতা আইনের ঊর্ধ্বে কি না নিষ্পত্তি হবে সুপ্রিম কোর্টে
(০৫) এক ক্যুইজ মাস্টার আর বাংলার ‘সবুজ লাড্ডু’র কাহিনি
(০৬) ম্যালেরিয়া মুক্ত হচ্ছে ভুটান-চিন-নেপাল সহ ২১টি দেশ
(০৭) সারদা-নারদের সত্য এবং মদন বনাম মদন আর মিত্র
(০৮) সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া
(০৯) সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!
(১০) রাজ-‘কুৎসা’য় যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা…!
(১১) বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর

_______________________________________________________________

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

Tree-bute: রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও