সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই প্রথমবার রামনবমীতে ফাঁকা ধুধু হাওড়া রামতলা মন্দির চত্বর। অন্যান্যবার রামনবমীর সকাল থেকেই হইচই পড়ে যায় রামপুজো নিয়ে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বুঝে অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের আগমন। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কেউ যেন মন্দিরে না আসেন। পুজো হবে রাম রাজার কিন্তু তা দেখার জন্য বা নিজের ও পরিবারের মঙ্গল কামনার জন্য যে পুজো সাধারন মানুষ দেন তা দেওয়া যাবে না।

রামরাজা পরিষদ ও রামমন্দির পরিচালন পরিষদের পক্ষে জানানো হয়েছে, ‘সকল জন সাধারণকে জানানো হয়েছে ২ এপ্রিল রামনবমীর দিন রাম মন্দিরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’। ১৭৫৭ সালে সাঁতরাগাছির প্রখ্যাত জমিদার অযোধ্যারাম চৌধুরী শুরু করেন এই রামের পূজা। সেই সময় হাওড়ার চৌধুরীনগর অঞ্চলে পূজা হত তিন দিন। অযোধ্যারামের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরেরাই পূজা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন হাওড়ার সখেরবাজারে, যা বর্তমানে রামচরণ শেঠ রোড।

আগে এখানে সরস্বতীর আরাধনা করতেন। সরস্বতী পূজাকে ঘিরে বসত বিশাল মেলা। অনেক বিরোধের পর, রাম আরাধনা শুরু হয় তৎকালীন হাওড়ার সখেরবাজারে। এখানে সরস্বতী থাকেন রামের মূর্তির মাথার উপর। সেই শর্তেই রামপুজো শুরু হয়েছিল। সেই শর্ত মেনেই এখনও ২৮ ফুট উচ্চতার বিশাল রামের মূর্তির মাথার উপরে বিরাজমান থাকেন সরস্বতী। তবে একটি নয়, রয়েছে পাঁচটি সরস্বতী মূর্তি৷

রামের মূর্তির বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে বলে জানান এই মন্দিরের বর্তমান ট্রাস্টিদের অন্যতম তপন চৌধুরী। তিনি বলেন, “আমাদের রামমূর্তি একমাত্র রামমূর্তি যার গোঁফ রয়েছে।” মূর্তির গোঁফের কারণ হিসাবে তিনি বলেন, “অন্যান্য স্থানে রামের যে মূর্তি আপনারা দেখেন, তা রামের বনবাসের মূর্তি। কিন্তু আমরা রামের রাজরূপের আরাধনা করি। আমাদের মূর্তির বেশভূষা থেকে শুরু করে শরীরী ভঙ্গিমা সবই রাজকীয়।” একই সঙ্গে তপন চৌধুরী বলেন, “রামের এই মূর্তি ঠিক কে তৈরি করেছিলেন তাঁর নাম আমাদের জানা নেই। তবে তাঁর বংশধরেরাই এখনও আমাদের মূর্তি গড়ছেন।”

শুরুর দিকে তিন দিন পুজো হতো। ক্রমে জনপ্রিয়তা বাড়ায়, তা ১৫ দিন হয়। এখন তা বাড়তে বাড়তে চার মাসে এসে দাঁড়িয়েছে। সরস্বতী পূজার দিনেই কাঠামোর বাঁশ কাটা হয়। এর পর চৈত্র মাসের শুক্লা নবমীর দিন শুরু হয় রামের আরাধনা। রামের পাশাপাশি এখানে পূজিত হন সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, বিভীষণ, হনুমান সহ ২৬ দেবতা। রয়েছে হনুমান, সাবিত্রী, সত্যবান, বামনের মন্দিরও। তবে এগুলি এই রামের মন্দির তৈরির অনেক পরে তৈরি হয়েছে বলেও জানান তপন চৌধুরী। রামের আরাধনাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলাও বসে এখানে। যা চলে পূজা শুরুর দিন থেকে পরের চার মাস অবধি। ছোটদের খেলনাবাটি, ভেঁপু, মুখোশ থেকে শুরু করে বড়দের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্য পাওয়া যায় এই মেলায়। তবে এসবই বন্ধ করোনার ধাক্কায় জারি হওয়া লকডাউনে।