সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা গীত হল ব্রহ্মসঙ্গীত। ব্রাহ্মধর্মের প্রবতর্ক শুধুু নন রাজা রামমোহন রায় , তিনিই আবার হলেন এই ব্রহ্ম সঙ্গীতেরও রূপকার। এটা ঘটনা পরবর্তীকালে ব্রহ্মসঙ্গীত জনপ্রিয় হয়েছে কারণ বিখ্যাত মানুষেরা এই গান লেখায় এগিয়ে এসেছিলেন।‌

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সহ বহু বিখ্যাত গীতিকার এগিয়ে এসেছেন ব্রহ্ম সঙ্গীত রচনায়। তবে এর সূচনা বলা চলে রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরেই। রাজা রামমোহন ১৮১৫ সালে আত্মীয় সভা গঠন করেন এবং ১৮২৮ সালে নিজগৃহে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মসঙ্গীত চর্চার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়। অদ্বিতীয় ব্রহ্মের উপাসনাকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মসমাজের প্রারম্ভিক ও সমাপ্তি অনুষ্ঠানে এই ব্রহ্মসঙ্গীত পরিবেশিত হতো সেই সময়।

ব্রাহ্মসমাজের দুই প্রধান গায়ক কালী মির্জা এবং বিষ্ণু চক্রবর্তী ছিলেন যথাক্রমে টপ্পাবিশারদ ও ধ্রুপদশিল্পী। তাই ব্রহ্মসঙ্গীতের সুরে টপ্পার অলঙ্কার ও ধ্রুপদের প্রাধান্য দেখা যায়। রামমোহন নিজে ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করে সুর দিয়ে গাইতেন। তিনি নিজে কতগুলি এই ধরনের গান রচনা করেছিলেন তা নিয়ে কিছুটা মতান্তর রয়েছে। তবে ব্রহ্মসঙ্গীত নামক গ্রন্থে তাঁর রচিত ৪৪টি গান সঙ্কলিত হয়েছে বলে কথিত।

তিনি তাঁর গানে ধ্রুপদ বন্দিশের বিন্যাস-কাঠামোয় স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগের আদল ব্যবহার করেছেন, যার ধারাবাহিকতা পরবর্তী সঙ্গীত রচয়িতাদের রচনায় সঞ্চারিত হয়েছে। সঙ্গীতপ্রিয় রাজা রামমোহন বুঝতে পেরেছিলেন, সঙ্গীত মানবমনের সাধারণ স্তর পার হয়ে গভীর অনুভূতির জগতে প্রবেশ করতে সক্ষম। তাই ধর্মের কঠিন তত্ত্বালোচনায় সঙ্গীতের নান্দনিকতা ব্যবহার করে তিনি ব্রাহ্মধর্মের বিকাশ সাধনে প্রয়াসী হয়েছিলেন। উনিশ শতকের প্রথমভাগে হিন্দুধর্মের সংস্কার সাধন করে একেশ্বরবাদিতার যে আদর্শ প্রচারে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন, সেই আদর্শ বাস্তবায়নের সহায়ক শক্তি ছিল এই ব্রহ্মসঙ্গীত।

সেই সময় কলকাতার নগরসভ্যতায় ব্রহ্মসঙ্গীতের উদ্ভাবন ছিল রামমোহনের একটি সঙ্গীতসংস্কারমূলক পদক্ষেপ। আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় সংস্কারমুক্ত আদর্শে পরিপুষ্ট এই ব্রহ্মসঙ্গীত বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও