স্টাফ রিপোর্টার, মালদহ: ঐতিহ্যবাহী পাঁচশো বছরের প্রাচীন রামকেলির মেলা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে মালদহে৷ প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের রামকেলী গ্রামে আজ থেকে ৫০৫ বছর পূর্বে জ্যেষ্ঠ সংক্রান্তির দিন চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন। আর সেই থেকে এই মেলা রামকেল মেলা বলে পরিচিতি লাভ করে।

মেলায় বাংলা সহ আশপাশের বহু ভক্তগণ আসেন। এবার এই মেলায় মালদার আমকে তুলে ধরা হবে। এই বছর চৈতন্যদেব, শ্রীরূপ এবং সনাতন গোস্বামীর মূর্তি বসানো হচ্ছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইংরেজবাজারের বিধায়ক নীহার রঞ্জন ঘোষ, জেলা শাসক কৌশিক ভট্টাচার্য,জেলা পরিষদের সভাধীপতি গৌড় চন্দ্র মণ্ডল সহ অন্যান্যরা।

বৈষ্ণব মতে সম্ভবত ১৫১৫ সালের জুন মাসে শ্রীচৈতন্য তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের রামকেলি গ্রামে আসেন। গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের মন্ত্রী সাকর মল্লিক ও প্রধান মুনশি দ্রাবীর খাস বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তী কালে এর দু’জন রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। রামকেলি গ্রামে শ্রীচৈতন্যের সেই পদার্পণের স্মরণে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তিতে এক মেলার আয়োজন করা হয়, যা রামকেলির মেলা নামে পরিচিত।

এটাই মালদা জেলার সব চেয়ে বড় ও প্রাচীন মেলা। বর্তমানে একই সঙ্গে শ্রী শ্রী মদনমোহন জিউ-এর বার্ষিক উৎসবও পালিত হয়। পঞ্চরত্ন মন্দিরে মহা ধূমধামে মদনমোহন ও রাধারানির পুজো হয়। মদনমোহন মন্দির ছাড়াও বেশ কিছু স্থায়ী ও অস্থায়ী আখড়া ঘিরে জমে ওঠে সাত দিনের মেলা।

আরও পড়ুন: কালামকে শ্রদ্ধা জানাতে নয়া উদ্যোগ বিজেপি নেতার

আগে রামকেলীর মেলা ১৫দিন ধরে চলত। সেখানে পূজার্চনার পাশাপাশি চব্বিশ প্রহর কীর্তনের আসর আবার কোথাও-বা বাউলের আসর বসে। সাধারণত এই মেলা সাধু, বাউল, ফকিরের মেলা বলে পরিচিত। ইতিমধ্যে সাধু, বাউল, ফকিরেরা আসতে আরম্ভ করে দিয়েছেন। রামকেলী গ্রামে আমবাগানের মধ্যে অস্থায়ী তাবু তৈরি করে সাধু ফকির বাউলের আখরাও বেশ জমজমাট। এই কীর্তন যেমন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সাধন ভজনের মাধ্যম, তেমনি পদাবলি সাহিত্য ও কীর্তন বঙ্গে সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য রয়েছে। কীর্তন এই উৎসবের মূল আকর্ষণ।

মালদা শহর থেকে দূরত্ব মাত্র দশ কিলোমিটার হলেও এই মেলা সম্পূর্ণ গ্রামীণ মেলা। গ্রামের মানুষদের চাহিদা মেটাতে তাদের পছন্দসই সম্ভার নিয়ে ব্যবসায়ীরা হাজির হন বিষুপুর, বীরভূম, বহরমপুর, কলকাতা ও বিদেশ থেকে। মালদা জেলার গ্রীষ্মের মেলা, তাই আম এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। দুই দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদ ছাড়াও ভক্ত দর্শনার্থী আসে।

মেলাস্থানের পাশেই রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত। ফলে ওপার বাংলার মানুষও এই মেলায় আসেন। জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির আগেই বর্ষা এসে যাওয়ায় বৃষ্টি ও কাদা এই মেলার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এক সময়ে ছিল। এখন তার পরিবর্তন ঘটে সেই রাস্তা পিচ ঢালাই রাস্তার পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে মেলার উন্নতি ঘটেছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে দেখা যায় এই মেলায়।

মালদা জেলা পরিষদের সভাধীপতি গৌড় চন্দ্র মন্ডল বলেন, ঐতিহ্যবাহি এই রামকেল মেলা প্রাচীন মেলা। দলমত ধর্মমত নির্বিশেষে মানুষ এই মেলায় অংশ নেয়। এবার তিনটি নতুন মূর্তি বসানো হয়েছে। পাশাপাশি মালদার বিখ্যাত আমকে তুলে ধরা হবে। আমের প্রদর্শনিও থাকবে।