প্রীতম সরকার: সময়টা ছিল ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের বড়দিনের পরে। সেসময় কলকাতায় এমএলএ হোষ্টেলের ঘরে খুন হয়েছিলেন উত্তর দিনাজপুরের ফরওয়ার্ড ব্লকের গোয়ালপোখরের বিধায়ক রমজান আলি। আর হেমতাবাদের বিজেপির বিধায়ক দেবেন রায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলো ২০২০ সালের ১৩ জুলাই। জেলায় দ্বিতীয় বিধায়কের অস্বাভাবিক মৃত্যু।

রমজান আলি এমএলএ হস্টেলে এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সময় আমি আনন্দ বাজার প্ত্রিকাতে সাংবাদিকতা করি। স্বভাবতই প্রথম নিউজ কভারেজ করতে হয়েছিল আমাকেই। সেসময় উত্তর দিনাজপুর জেলার বাম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ন আলাদা ছিল। সিপিএমের সঙ্গে ফরওয়ার্ড বক্লের সম্পর্ক এতটা ভালো ছিলনা।

নিজের চোখেই দেখেছিলাম, সেসময়ের রমজান আলির মরদেহ সড়কপথে চাকুলিয়ার রমজানের নিজস্ব গ্রাম বেলনে নিয়ে যাওয়ার সময় সিপিএমের সাসংদ সুব্রত মুখার্জীর সঙ্গে প্রায় হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন রমজানের ভাই হাফিজ আলম সাইরানি।

পরে অবশ্য গোয়ালপোখর বিধানসভার আসনেই রমজান আলির মৃত্যুতে যে ‘বাই ইলেকশন’ হয়েছিল, সেখানে জিতে হাফিজবাবু প্রথমে বিধায়ক এবং পরে মন্ত্রী হয়েছিলেন। সেসময় চাকুলিয়ার বর্তমান বিধায়ক আলি ইমরান রমজ ওরফে ভিক্টর সবেমাত্র প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্র মাত্র। এমএলএ হস্টেলে নিজের ঘরে খুন হয়েছিলেন উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরের বিধায়ক রমজান আলি।

পুলিশের তদন্তে প্রকাশ, সেই সময় সেই ঘরে হাজির ছিলেন রমজানের স্ত্রী তালাত সুলতানা এবং প্রাক্তন বিধায়ক রেণুলীনা সুব্বা। পরে তদন্তে উঠে আসে তালাত এবং রমজানের প্রাক্তন আপ্ত সহায়ক নুরুল ইসলামের মধ্যে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কথা। আদালতের নির্দেশে দু’জনই বর্তমানে যাব্জজীবন কারাবাসে জেলে বন্দি। হেমতাবাদে বিধায়ক দেবেন্দ্রনাথ রায়ের রহস্যময় মৃত্যু হয়েছে সোমবার। যা নিয়ে খুনের অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।

তবে প্রাথমিক তদন্তের শেষে প্রশাসনের বক্তব্য, সম্ভবত এটি আত্মহত্যার ঘটনা। কিন্তু সেই ঘটনাও কয়েকটি জবাব না-পাওয়া প্রশ্ন রেখে গিয়েছে। যেমন, বাড়ি থেকে এত দূরে এসে আত্মহত্যা কেন করলেন বিধায়ক বা এত দূর কাদা ঠেঙিয়ে এলেন, কিন্তু পায়ের তলায় ছাড়া পোশাকের কোথাও কাদা লেগে নেই কেন? ১৯৯৪ সালে রমজান মার্ডারের কোন তদন্ত শুরুর আগেই বামফ্রন্টের তৎকালীন চেয়ারম্যান শৈলেন দাশগুপ্ত ঘোষনা করে দিয়েছিলেন, ‘এটা পারিবারিক মার্ডার।’

যাইহোক, লালবাজারের গোয়েন্দারা সব এসে ঘাঁটি গেড়েছিলেন, বিহারের কিষানগঞ্জে। সেখানেই রমজান আলি সপরিবারে থাকতেন। আর আমরা, সাংবাদিককুল, ওই রমজান আলির বাড়ির পাশের এক লাইন হোটেলের খাটিয়ায়। সেসময় মোবাইল ফোন দূরের কথা, ল্যান্ড টেলিফোনও এতটা সহজলভ্য ছিলনা। গোয়েন্দাদের ওই বাড়িতে ঢুকতে দেখলেই দৌঁড়ে চলে যেতাম ওই বাড়িতে।

একবার তো ডিসি-ডিডি-ওয়ান কে তালাত ঝাঁড়ু হাতে ধাওয়া করতে দেখেছিলাম। সেসব খবর লিখে ফ্যাক্সে পাঠাতে হতো। যেরাতে তালাতকে পুলিশ ওই বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা এতটাই গোপনে নিয়ে রওনা দিয়েছিল, যে কয়েক মিটার দূরের লাইন হোটেলে আমি সহকর্মীদের সঙ্গে রাত জেগে থাকলেও কিছু বুঝতে পারিনি।

যাইহোক, দেবেন রায়ের রহস্য মৃত্যু তাই আমাকে রমজান আলি খুনের কথা নতুন করে মনে করয়ে দিচ্ছে। সেসময় আলাত আমাকে বলেছিলেন, ‘লোকে আমাদের লায়লা মজনু বলে, খুন করতে যাবো কেন?’ একথা এখনও পরিস্কার মনে রয়েছে। আমার নিজের চোখেও এই খুনের ঘটনায় অনেক অসঙ্গগতি ধরা পড়েছে বিভিন্ন সময়ে। যেহেতু আনন্দ বাজার এই মামলার খবর করার অনেকটা দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিল, তাই প্রতি নিয়ত নজর রাখতে হতো, এই কেসের গতিবিধির উপর। তখনও পুলিশের জমা দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী নুরুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।

আমি এক দুপুরে পুলিশ সুপারের বাংলো থেকে কাজ সেরে বের হচ্ছি, সেসময় দুজন গ্রামের লোককে এসপির বাংলোতে চোখের সামনে ঢুকতে দেখেও সন্দেহ হয়নি। সেটাই ছিল নুরুল ইসলাম। কাগজ কলমে “রায়গঞ্জ শহরের শিলিগুড়ি মোড় থেকে পুলিশ গোপন শূতের খবরে গ্রেফতার করেছে” দেখানো হলেও, বাস্তবে নুরুল তাঁর দাদার সঙ্গে এসপির বাড়িতে গিয়ে আত্মসম্পর্ন করেছিল।

আমি যে নুরুলকে চিনিনা, সেটা এসপি বানীব্রত বসু জানতেন না। তাই তিনি আমার বা সাংবাদিকদের এড়াতে সেই রাতে কালিয়াগঞ্জ থানায় গিয়ে বসে ছিলেন। পরেরদিন প্রেস কনফারেন্স করে নুরুল ইসলাম গ্রেফতারের খবর দেওয়ায় সময় আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসেছিলেন। এর আগে ফরোয়ার্ড ব্লক ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ নামে এক কমটি গঠন করেছিলো।

বর্ষীয়ান ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা ভক্তিভূষন মন্ডল সেসময় অপেক্ষাকৃত তরুন অশোক ঘোষকে এই কমিটির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই কমিটি আজ পর্যন্ত কোন ‘ফ্যাক্ট’ উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এখন অশোকবাবু বা ভক্তিবাবু- দুজন এখন আর পৃথিবীতে নেই। আইনের পথে পুলিশের নথির ভিত্তিতে তালাত- নুরুল দুজনেরি যাব্জজীবন সাজা হয়। পরে হাফিজবাবুর পরে রমজান আলির ছেলে ভিক্ট্রর এখন সেখানকার বিধায়ক। পরে এই মামলার পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট পড়ে জেনেছিলাম, দফায় দফায় বয়ান বদলেছিলেন রমজানের স্ত্রী তালাত।

প্রথমে তিনি পুলিশকে বলেন, চার দুষ্কৃতী এসে তাঁদের মারধর করে অজ্ঞান করে দেয়। জ্ঞান হয়ে দেখেন, হাত-পা বাঁধা। পাশে পড়ে আছেন রমজান। পরে আদালতে তিনি জবানবন্দি দেন, রমজানের একসময়ের গাড়ির চালক রবি শিকদার এসে খুন করেছে। নিজের সঙ্গে রবির সম্পর্কের কথা স্বীকারও করেন। কিন্তু তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, রবি সে দিন নদিয়ায় নিজের বাড়িতেই ছিলেন। সে প্রমাণ এতই অকাট্য যে জামিন পেয়ে যান রবি। নতুন পথে ভাবতে শুরু করে পুলিশ। একটি দল যায় উত্তর দিনাজপুর।

আর একটি দল কলকাতার এমএলএ হস্টেলের আশপাশের দু-তিন কিলোমিটার চষে ফেলে। তখন অনেকেই এসটিডি বুথ থেকে ফোন করতেন। সেই সব বুথে ঘুরতে থাকেন পুলিশের লোকজন।

শেষ পর্যন্ত জানুয়ারির শেষ দিকে গিয়ে চৌরঙ্গি লেনের একটি পিসিও বুথ থেকে জানা যায়, সেখান থেকে নিয়মিত দিল্লির একটি নম্বরে ফোন করতেন তালাত। মূল দুই অভিযুক্ত নুরুল এবং তালাত আদালতে দোষ স্বীকার না করলেও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, রমজানের ডায়েরি আর নুরুলকে লেখা তালাতের চিঠি থেকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাঁদের। হয়ে যায় যাবজ্জীবন সাজা।

রমজানের ছেলে আলি ইমরান রমজ (ভিক্টর) তখন স্কুল পড়ুয়া। বর্তমান তিনি চাকুলিয়ার ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক। ভিক্টরের অবশ্য দাবি, ‘‘বাবাকে ষড়যন্ত্র করে খুন করা হয়েছে। কিন্তু এই খুনের সঙ্গে মা জড়িত নন। মাকে ফাঁসানো হয়েছে।’’ আবার পুলিশের আত্মহত্যার বক্তব্যকে উড়িয়ে সি আই ডি দেবেন রায়ের মৃত্যুতে খুনের মামলা দায়ের করায় নতুন করে রহস্য দানা বাঁধতে শুরু করেছে।।

পোস্ট এডিট লেখকের নিজস্ব মতামত। kolkata24x7-এর কোনও দায় নেই।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ