শেখর দুবে: “মন মেরা রাম রাম রঠে”, সত্তরের দশকে শুধু বাংলা নয় সারা ভারত মজেছিল এই গানে। ১৯৭৪ সালে সত্যজিৎ রায়ের বাংলা ছবি ‘সোনার কেল্লা’র এই গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। কিন্তু আজ যদি সত্যজিৎ বেঁচে থাকতেন? তাহলে তাঁকেও কী ” রাম” নামের ব্যবহারের জন্য “মহামান্যা” র কোপে পড়তে হত? কিংবা “ভবিষ্যৎতের ভুত”-এর মতো অতীতের সত্যজিৎ ব্যন হতেন বাংলার প্রেক্ষাগৃহে? সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু শেষ কয়েক বছরে বাংলা যে ” রাম চক্ষুশূল” হয়ে উঠেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় বামপন্থী নেতা প্রয়াত সুরঞ্জন সেনগুপ্তকে নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। গল্পটি এরকম, স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ইসলামি মৌলাবাদ মাথা চাড়া দিচ্ছে এরকম এক সময়। সুরঞ্জন বাবু তখন বাংলাদেশ পার্লামেন্টের সদস্য। তখন পার্লামেন্টে ঢোকার মুখেই একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। একদিন বাংলাদেশের সংসদের কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তুললেন কৃষ্ণ হিন্দুদের দেবতা। বাংলদেশ মুসলিমদের জন্য। অতএব গাছের নাম পাল্টাতে মুসলিম ধর্মের মহান ব্যক্তির নামে রাখা উচিৎ। বাকপটু এবং রসিক সুরঞ্জিত উপস্থিত ছিলেন সেখানে। উনি সঙ্গে সঙ্গে সেই সাংসদের সমর্থণ করে বলেন, ঠিক কৃষ্ণচূড়া নাম পরিবর্তণ অবশ্যই করা উচিৎ। কিন্তু হিন্দুরা “রামছাগল” বলেও একটি প্রাণীকে ডাকে। আপনারা যদি একই বিচার ওই প্রাণীটির জন্যও করে নাম পরিবর্তন করেন তাহলে ভালো হয়। কতিথ আছে এরপর যতদিন ওই গাছটা কাটা না হয়েছিল “কৃষ্ণচূড়া” নাম নিয়ে কারও সমস্যা হয়নি।

বাংলায় তৃণমূল সরকার এসে পাঠ্যবই থেকে “রামধনু” শব্দ থেকে “রাম”-এর বামটুকু সরিয়ে ” রংধনু” করেছে। যদিও এর কোন যুক্তি গ্রাহ্য কারণ দর্শাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দফতর। এই ঘটনার পর বাংলার হিন্দুরা প্রতিবাদ করলেও “রংধনু” আর রামধনু হয়নি। এভাবেই শেষ কয়েকবছরে বিজেপি বা সিপিএম নয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা শ্রী রামচন্দ্র।

মাঝে মাঝে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রশ্ন তোলা হয় “বিজেপি কী হিন্দুদের” ঠিকা নিয়ে রেখেছে? এই মুহূর্তে বাংলা তথা ভারতে দাঁড়িয় এই প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টই বলা যায় “হ্যাঁ”। কিন্তু বিজেপিকো হিন্দুদের এই মৌরসিপাট্টা সপেছেন কারা? এই আপনারা, যারা রামায়ণ মহাভারতে হিংস্রতা ছাড়া কিছু দেখতে পান না। যাদের কাছে হিন্দুরা হিংস্র জাতি। কিংবা যে দলের সুপ্রিমো ” জয় শ্রী রাম ” শুনে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে চিৎকার করেন আমাকে গালাগাল করছে বলে। এবং অবাকভাবেই এখনও বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাই। হিন্দুদের ভয় ও অপমানের জায়গাগুলো তৈরি করে দিচ্ছেন সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেসের নেতারা৷ স্বাভাবিকভাবেই বিজেপিকে আশ্রয় হিসেবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন হিন্দুরা।

ম তো এক সাধারণ ভারতীয় ছেলে৷ যে বাবার সম্মান রক্ষায় এক মুহূর্ত না ভেবে অয্যোধ্যার রাজ ঐশ্বর্য ছেড়ে বনচারী তপস্বী হয়েছিলেন৷ নিজের স্ত্রী ও ভাইয়ের সাথে পর্ণকুটিরে সংসার বেঁধেছিলেন৷ একদম নন্দীগ্রাম, নেতাই, মরিচঝাঁপি, ধূলাগড়, কালিয়াচকের সাধারণ আমার আপনার মতো। তাকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য করেছিল রাবণসহ অসুরকূল৷ রাবণনাশের পর তিনি আবার শান্ত অবস্থায় ফিরে গেছিলেন৷ সোনার লঙ্কার ঐশ্বর্য কে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী”। এইভাবেই কর্মগুণে জনমানসে দেবতা শ্রী রামের উদ্ভব। কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসা হিন্দু সংস্কৃতির আত্মার সঙ্গে মিশে রয়েছে ” জয় শ্রী রাম” শ্লোগান। সেটি কী ভাবে কারও রাগের কারণ হতে পারে তা সত্যিই অবাক করে।