সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : শহরের বুকে অলক্ষ্যে লুকিয়ে এই রাম মন্দির। কোনও আড়ম্বর নেই। আজ রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে দেশে হইচই। তখনই এই রাম মন্দিরের শহরের এক কোনে বর্তমান জৌলুসহীন অবস্থায়। তবে সঙ্গে নিয়ে অনেক ইতিহাস। গিরিশ পার্কের কাছে জোড়াসাঁকোর দাঁ পরিবারের বাড়ির পিছনে বর্তমান বহু পুরনো এই রাম মন্দির।

শিবকৃষ্ণ দাঁ লেন দিয়ে এঁকে বেঁকে গিয়ে এক পুরনো বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে মন্দিরের দেখা মেলে। ঢুকতেই বাম ও ডান দিকে পড়ে দুটো করে মোট চারটি প্রাচীন শিব মন্দির। তারপর রয়েছে একটি বিশাল মাঠ। এসব পেরিয়ে কয়েকটি সিঁড়ি দিয়ে উঠে দালান লাগোয়া একতলা এই রাম মন্দির। বাইরে থেকে দেখা যায় মন্দিরের গ্রিলের দরজা। মন্দিরের ভিতরের বিগ্ৰহ স্পষ্ট। অপূর্ব অষ্টধাতুর এক হাত সমান রাম লক্ষ্মণ সীতা আর হনুমানের মূর্তি। রাজারাম বসে আছেন। তার এক পাশে সীতা। মাথায় ছাতা ধরে আছেন লক্ষ্মণ। আর তাঁদের তিনজনের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে হনুমান।

বাংলার শিল্পীরা নিজস্ব রীতিতে রাম লক্ষণ সীতার এই রাম দরবার মূর্তি গড়েছেন। আসলে শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তির প্লাবনে এই শিল্পীরা ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক যোগসূত্র রচনা করেন ।তাই অনেক জায়গায় কাঠের মূর্তি তে রামচন্দ্র কে যোগী পুরুষ হিসেবে দেখা যায়।অবাঙালিদের পাথরের বা ধাতুর দাঁড়ানো‌ রামের মূর্তি সাধারণত তীর ধনুক সহ যোদ্ধার ।কিন্তু বাংলায় রামদরবারে রামের কোথাও কোথাও তীর ধনুক হাতে থাকলেও তাঁঞর মধ্যে এক অদ্ভুত কমনীয় ভাব লক্ষ্য করা যায়। যা এই মূর্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে ।এখানে রাজারামের যেন এক অদ্ভুত সৌম্য দর্শন ।নেই তাঁর রাজা সুলভ কোন পরাক্রমশীলতা বা অহং। আবার সীতা মায়ের আশিসের ভঙ্গিতেও যেন ভক্ত বাৎসল্যের রূপটিকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। তাঁর মধ্যেও কোন রানীর অহং নেই।

মন্দির বেলা এগারোটা থেকে দুপুরে শয়নের আগে দর্শন হবে। আবার বিকেল পাঁচটা থেকে মন্দির খোলে। প্রসঙ্গত, পঞ্চদশ শতকে বাংলার মানুষকে রামায়ণের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিলেন কৃত্তিবাস ওঝা। ফুলিয়া নিবাসী এই মহান কবি তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে যে রাম লক্ষণ সীতার উপাখ্যান শুনিয়েছিল তাঁরা দেবতার বদলে বাংলার মানুষের ঘরের লোক হয়ে গিয়েছেন। বাঙালি তাই বিদেহী আত্মা বা ভূতকে ভয় না পাওয়ার জন্য বিশেষ করে শিশুদের মনে যে ছড়া লুকিয়ে রয়েছে তা ‘ভূত আমার পুত পেত্নী আমার ঝি , রাম লক্ষণ বুকে আছে ভয়টা আমার কি’। আবার বাংলা প্রবাদও হয়েছে রামায়ণের থেকে। কেউ একটা বিষয় যদি সব শুনে না বোঝে সেখানে বলা হয় ‘সাত কান্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি’।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও