শেখর দুবে: দেবত্বটুকু বাদ দিলে রামায়ণে বর্ণীত রামচন্দ্র ভারতের সন্তান৷ যিনি প্রাচীন ভারতের দর্শণ, মূল্যবোধের প্রতীকও৷ সমালোচকরা প্রায়শই রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে বর্ণীত ‘শম্বুক হত্যা’র বিষয়টি নিয়ে রামের সমালোচনা করে থাকেন৷ কিন্তু সত্যিই কী রামের মতো এক চরিত্রের হাত দিয়ে শম্বুকের হত্যা সম্ভব? ইতিহাস এবং রামায়ণে বর্ণীত বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনা কী ‘রামের হাতে শম্বুক বধে’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে রামের হাতে শূদ্র তপস্বী শম্বুকের বধ লেখা রয়েছে। ঘটনাটি এই রূপে বর্ণিত,লঙ্কা থেকে ফিরে রাম রাজা হয়েছেন। হঠাৎ কিছুদিন পর এক ব্রাহ্মণ তার অকালমৃত সন্তানকে নিয়ে রামের দরবারে আসেন এবং বলেন যে রামের রাজ্যে নিশ্চয় কোনও পাপ হচ্ছে, তাই তার ছেলে অকালে মারা গেল। তখন নারদ মুনি সহ অনেকে বলেন নিশ্চয় রাজ্যের কোথাও কোনও শূদ্র তপস্যা করছে, তাই এমনটা হয়েছে। এরপর দক্ষিণ দিকে গিয়ে রাম শম্বুকের খোঁজ পান। শম্বুক শূদ্র হয়েও তপস্যা করছে জানতে পেরে তার মাথা কেটে ফেলেন৷

এই ব্যাপারে মূল পর্বের আলোচনায় যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস ঘেঁটে নিই আসুন। প্রাচীন ভারতে বর্ণব্যবস্থা বংশানুক্রমিক ছিল না। বর্ণ ছিল পেশা ভিত্তিক এবং পেশা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণও পরিবর্তন করা যেত।

এর একটা বড় উদাহরণ দিই। ভারতবর্ষে রামায়ণের যুগে একজন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ ছিলেন ঋষি বিশ্বামিত্র। তিনি জন্মগত ভাবে ব্রাহ্মণ ছিলেন না। কর্ম এবং তপস্যার গুণে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিলেন। এই বিশ্বামিত্রের প্রতি রামের আচরন কীরূপ ছিল?
প্রজার বিপদ শুনি রামের তরাস। / ধাইয়া গেলেন রাম বিশ্বামিত্র-পাশ।। ২১৯৯
মুনির চরণ ধরি বলে রঘুমণি/ প্রজালোকে রক্ষা প্রভু করহ আপনি।। ২২০০
কৃত্তিবাসী রামায়ণ (আদিকাণ্ড)/পুরো রামায়ণ জুড়ে রাম এবং অন্যান্য চরিত্ররা বিশ্বামিত্রকে গুরুজ্ঞানে পুজো করে গেছেন৷

যে কোনও রচনা কিংবা মহাকাব্য সেই সময়কার সমাজের ছবি তুলে ধরে। যেমন এই বৈদিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চতুরাশ্রম,
ব্রহ্মচর্য – শৈশব থেকে যৌবন অবধি গুরুগৃহে থেকে শিক্ষা লাভ। গার্হস্থ্য – এরপর গুরুগৃহ থেকে ফিরে বিবাহ ও সংসার ধর্ম। বাণপ্রস্থ – সংসার ত্যাগ করে বনের জীবন যাপন। সন্ন্যাস – সবশেষ ঈশ্বরের আরাধনায় দিন কাটানো। এই চতুরাশ্রমের প্রথম দুটি আশ্রমের উদাহরণ রামায়ণের শুরুতে রামের জীবনে পাওয়া যায়, পঞ্চবর্ষ গত হয় হাতে দিল খড়ি। পড়িতে পাঠান রাজা বশিষ্ঠের বাড়ি।।১৯১৩ আদিকান্ড (কৃত্তিবাসী রামায়ণ)

তাহলে বুঝতেই পারছেন প্রাচীন ভারতের সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়েই রামায়ণ লেখা। এখন সে যুগে বর্ণপ্রথা ছিল এটাও যেমন সত্য। তেমনই সত্য অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা বর্ণ পরিবর্তন সম্ভব ছিল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে শম্বুক তপস্যা করে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে চাইলে তা পাপই বা হবে কেন? আর কেনই বা রাম তাঁকে বধ করবেন? এর উত্তরে পরে আসছি তার আগে আরও কিছু বিষয় এখানে বলে নিই।

১) রাম অযোধ্যার রাজকুমার। অযোধ্যা সেই সময় ভারতের শ্রেষ্ঠ জনপদ। রাম চাইলেই রাবণকে পরাজিত করতে প্রতিবেশী রাজাদের সাহায্য নিতে পারতেন। অন্তত চেষ্টা করে দেখতে পারতেন। কিন্তু উনি তা না করে কাদের সাহায্য নিলেন? বানর, নিষাদ এদের। অর্থাৎ যারা বর্ণগতভাবে শূদ্রেরও নীচে। তাদের সঙ্গে থাকলেন, উঠলেন, বসলেন, খেলেন।

২) শবরীকে মনে আছে? ইনিও ক্ষত্রিয় ছিলেন না। ব্রাহ্মণও নন। তবে রাম, এঁর এঁটো কুল খেয়েছিলেন।

যে ছেলে বানরদের সঙ্গে বছরের পর বছর কাটাচ্ছে, শবরীর দেওয়া এঁটোকুল খাচ্ছেন, সেই ছেলে হঠাৎ করে শম্বুককে বধ করবেন? তাও আবার শূদ্র হয়ে তপস্যা করার কারণে? সঙ্গত লাগছে বিষয়টি? না প্রাচীন ভারতের সামাজিক রীতি না রামের চরিত্র, কোনটাই কিন্তু শম্বুকের ঘটনাকে মান্যতা দেয়না। তাহলে কী?

শম্বুক বধ, সীতার বনবাস, সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতো বিষয়গুলি রয়েছে রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে। এই ঘটনাগুলি বাল্মীকির মূল রামায়ণের অংশই নয়। এগুলি সময় অনুসারে রামায়ণে ঢোকানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন কেন ঢোকানো হয়েছে? রামায়ণ লেখা হওয়ার সময় থেকেই এই মহাকাব্য নিজগুণে ভীষণ জনপ্রিয় এবং বিশ্বাসযোগ্য ভারতবর্ষের সাধারণ সনাতনী হিন্দুদের কাছে। এই বইতে কোন কিছু লেখা থাকলে সেটা পালন করার রীতিরেওয়াজ চালু হওয়ার সুযোগ থাকছে (যেমন দুর্গার অকাল বোধনে পুজো)।বৈদিক পরবর্তী যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বাড়লে শূদ্রদের বেদ ও তপস্যা থেকে বঞ্চিত করার জন্য এইসব শম্বুকের গল্প রামায়ণে জায়গা পেতে শুরু করে।

আরও ভালোভাবে বললে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢোকানো হতে শুরু করে এবং তারপর থেকে আজ অবধি ধীরে ধীরে বিশ্বামিত্র তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করার বদলে বংশানুক্রমিক হতে শুরু করল৷ বর্ণব্যবস্থার আইডিওলজি চেঞ্জ হল। এবং এই উদ্দেশ্যেই কিন্তু শম্বুক বধ, ঠিক একইভাবে মেয়েদের কন্ট্রোল করার ভাবনা থেকে সীতার বনবাস কিংবা অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে আসা হয়েছিল রামায়ণে৷ শূদ্রদের বেদ এবং শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই মূলত ‘শম্বুকের’ গল্প ঢোকানো হল রামায়ণে৷

বাল্মীকির রামায়ণ ছাড়াও ভারতবর্ষে নানা ভাষায় রামায়ণ লেখা হয়েছে। যার মধ্যে তুলসী দাসের রামচরিৎ মানস, কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালী রয়েছে। এঁরা নিজের মতো করে রামায়ণকে কাঁটাছেঁড়া করেছেন। যেমন বাল্মীকির রাম দুর্গাপূজো করেননি, কিন্তু কৃত্তিবাস রামকে দিয়ে দুর্গা পুজো করিয়েছেন।

প্রাচীন হিন্দু ধর্ম সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অসুবিধে তুলসী দাস থেকে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি যে যখন যেমন পেরেছেন রামায়ণ, মহাভারতকে সম্পাদণা করেছেন৷ তার ফল আমরা ভোগও করছি। রাম কেন শম্বুক হত্যা করেছে কিংবা সীতার বনবাস, অগ্নিপরীক্ষা, পাতাল প্রবেশের ঘটনা কালিমালিপ্ত করছে ভারতবর্ষের বুকে জন্মানো শ্রীরামের চরিত্র।

যত সময় যাবে রাম এবং রামায়ণকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হবে। যেমন আপনি মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘সীতায়ণ’ পড়ে থাকলে রামকে আপনার পেট্রিয়ার্কাল ভিলেন মনে হবে। আবার মাইকেল মধূসুদনের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য পড়লে ইন্দ্রজিৎকে হিরো! যদিও এইসব গল্পের সঙ্গে আদি রামায়ণের কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। ঠিক একইভাবে আদি রামায়ণের রামের হাত দিয়ে শম্বুকের হত্যা হয়নি৷ বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদীতভাবেই শম্বুকের গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে রামায়ণে৷

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও