রাজেশ খান্নার আত্মজীবনীর লেখক ইয়াশির উসমান একবার এক ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন, ‘আমি রাজেশ খান্নার আত্মজীবনী লেখাকালীন এক বাঙালি ভদ্রমহিলার ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। সেই ভদ্রমহিলাকে আমি যখন প্রশ্ন করি, রাজেশ খান্না আপনার কাছে কে? তিনি উত্তরে বলেন, তুমি বুঝবে না, তোমার বোঝার বয়স হয়নি।

আমি যখন ওনার সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতাম, তখন সুন্দর শাড়ী পরে, বিউটি পার্লার থেকে মেকআপ করে তারপর যেতাম। এবং শুধু আমি নই, আমার মতো হাজার হাজার, লাখ লাখ মেয়েরা একইভাবে আসতো।

কারণ ওই ২ ঘন্টা হতো আমাদের রাজেশ খান্নার সাথে ডেট। উনি যখন পর্দার ওপর থেকে চোখে চোখ মেলাতেন আমাদের সাথে, উনি যখন মাথা নাড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে হাসতেন আমাদের দিকে তাকিয়ে, আমাদের হৃদস্পন্দন থমকে যেত…’ হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ভারতের প্রথম সুপারস্টার, যিনি পরপর ১৫টা সুপারহিট ফিল্ম উপহার দিয়েছিলেন, যিনি সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াই ভাইরাল হয়েছিলেন ১৯৬০-৭০ এর দশকে, যিনি মাদকের মতন ছড়িয়ে পড়েছিলেন আকাশে বাতাসে, সেই রাজেশ খান্নার ব্যাপারে। ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৪২ এ জন্ম গ্রহন করেন, তখন তার নাম ছিল যতীন খান্না।

১৯৬৬ সালে ‘আখরি খত’ সিনেমায় রাজেশ খান্না নামে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ চলচিত্র জগতে টরর। সিনেমাটি ১৯৬৭ সালে ভারতের প্রথম চলচিত্র হিসাবে অস্কার এন্ট্রি পায়। এরপর তাকে আর ঘুরে তাকাতে হয়নি কোনোদিন। নিজের জৈবৎকালে তিনি ১৬৮টার বেশি ছায়াছবি করেন। শোনা যায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিক থেকেই খুব এরোগেন্ট ছিলেন তিনি।

প্রথম ছবির শুটিংয়ের প্রথম দিনেই সকাল ৮টায় সেটে পৌঁছানোর সময় দেওয়া থাকলেও, তিনি প্রায় তিন ঘন্টা দেরি করে বেলা ১১টার সময় সেটে পৌঁছান। সিনিয়র শিল্পীরা তাকে বকা দিলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘তিনি কোনো কিছুর জন্যই নিজের লাইফ স্টাইল বদলাবেন না’।

এরকম ঔদ্ধত্য মানুষকে হয় খুব নীচে নামিয়ে নিয়ে যায়, নয় মেঘেদের ওপরে বানিয়ে দেয় বিলাসবহুল বাড়ি-ঘর-সংসার। রাজেশ খান্নার সাথে দ্বিতীয়টি হয়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ অবধি তিনি টানা একটার পর একটা সুপারহিট ব্লকব্লাস্টার ফিল্ম দিতে থাকেন। আখরি খত, রাজ, অউরাত, ডলি, ইত্তেফাক, বাহারো কে স্বপ্নে, আরাধনা, হাতি মেরে সাথী ইত্যাদি। আরাধনা সিনেমা রিলিজ করার পর তিনি ভারতীয় সিনেমা ভক্তদের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন, ফিল্ম ক্রিটিক্সরা তাকে ‘ভারতের প্রথম সুপারস্টার’ এর আখ্যা দেন।

জনপ্রিয় চিত্রনাট্য লেখক সেলিম খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘রাজেশ খান্না ভারতের সব থেকে বড় সুপারস্টার ছিলেন, আছেন, থাকবেন। সলমন খান, শাহরুখ খান, রাজেন্দ্র কুমার কেউ তাকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারবেন না। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ অবধি রাজেশ খান্না জমানায় ও যা স্পর্শ করেছিল, তা আজ অবধি কেউ পারেনি।’ কিন্তু কারণ কী?

তিনি জানান, ‘কারণ রাজেশ খান্নাকে পাশের বাড়ির ছেলের মতো দেখতে ছিলো, খুব সাধারণ, ওর হাসিটা খুব চার্মিং ছিল, ওর ভয়েস খুব ভালো ছিলো, মিউজিকের প্রতি খুব ভালো সেন্স ছিল…’। যে মানুষের সফেদ গাড়ি লাল হয়ে যেত লিপস্টিকের দাগে, যার চলন্ত গাড়ি থেকে ওড়া ধুলো নিয়ে সিঁথিতে ভরে নিতো সুন্দরীরা, যাকে এক নজর দেখার জন্য জনজোয়ার সামলাতে হিমশিম খেতো প্রশাসনিক বাহিনী সেই মানুষটার শেষ জীবনটা কিন্তু কেটেছিল বড়ো নিঃসঙ্গ অবস্থায়।

কথায় বলে অসফলতা তত মানুষকে নিঃশেষ করতে পারেনি, যতটা করেছে সফলতা। রাজেশ খান্নার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। একটার পর একটা সফলতার সিঁড়ি চড়তে চড়তে কখন যে তিনি তার ঔদ্ধত্য, জীবনযাপনের ভঙ্গিমা সব পাল্টে ফেলেছিলেন তিনি বোধহয় তা নিজেও লক্ষ্য করেননি। জীবনের শেষের দিকে তিনি নিজের অফিসেই থাকতেন। তার বসত বাড়ি ইনকাম ট্যাক্স দপ্তর দ্বারা সিল করা হয়েছিল।

তিনি রোজ বিকালে তার অফিস থেকে ড্রাইভ করে কিছুটা দূরে একটি ম্যাক ডোনাল্ডসে রেস্টুরেন্টে যেতেন। একটি বার্গার আর স্ট্রবেরি মিল্কশেক অর্ডার করতেন। আর অপেক্ষা করতেন, কেউ যদি তাকে চিনতে পেরে কাছে এসে হাত মেলায়, কেউ যদি তার সাথে একটা ছবি তুলতে চায়, কেউ যদি বলে ‘স্যার, বিগ ফ্যান। একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লিজ?’

মাত্র ৬৯ বছর বয়সে ২০১২ সালের ১৮ জুলাই, ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। হসপিটালের সফেদ বেডে শুয়ে, রুগ্ন মানুষটা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নিতে নিতে মৃদু কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘টাইম আপ হো গেয়া, প্যাক আপ…’ মনে পড়ে যায় আনন্দ সিনেমার সেই বিখ্যাত ক্লাইম্যাক্স সিন, যেখানে অমিতাভ বচ্চন মৃত রাজেশ খান্নার শরীরটাকে জোরে জোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলছেন, ‘উঠো। তুম নাহি মর সাকতে। তুম নাহি মর সাকতে। উঠো…’। ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে আসে রাজেশ খান্নার গলার আওয়াজ, ‘বাবুমশাই…’।

আর প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে পড়ে সিটির আওয়াজে। শুভ জন্মদিন রাজেশ খান্না। এই পৃথিবীতে নয় ঠিকই, কিন্তু আমি নিশ্চিত অন্য কোনো পৃথিবীতে ঠিক এই মুহূর্তে, হাজার হাজার প্রেক্ষাগৃহে একটা হুডখোলা গাড়িতে বসে গাইছেন, ‘মেরে স্বপ্নো কি রানী কাব আয়েগি তু…’,

আর চোখের পলক কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে যখনই স্ক্রিনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক তাকিয়ে হাসছেন, তখনই লাখ লাখ যুবতীর মেকআপ, সুন্দর শাড়ি আর বিউটি পার্লারের সাজ স্বার্থক হয়ে যাচ্ছে, তখনই তাদের এক মুহূর্তের জন্য থমকে যাচ্ছে হৃদস্পন্দন। আবার…

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

জীবে প্রেম কি আদৌ থাকছে? কথা বলবেন বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অর্ক সরকার I।