সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: অবাক হলেও এটা ঘটনা কঠিন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বয়ং অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করতে হয়েছিল ৷ ১৯০৮ সালে পাবনায় আয়োজিত কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতি হয়েছিলেন কবিগুরু ৷ সে বারে প্রথা ভেঙে বাংলায় সভাপতির ভাষণও দিয়েছিলেন তিনি ৷ তবে তারও আগে থেকেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সঙ্গে সংযোগ হয়েছিল রবি ঠাকুরের৷ কারণ তাঁর দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৭ সালে নাটোরে প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতি হন৷ ওই বারে সভাপতির ভাষণের বঙ্গানুবাদ পড়েছিলেন তিনি৷ তার পরের বছরও ঢাকা সম্মেলনে সভাপতি রেভারন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণেরও বঙ্গানুবাদ তিনি পাঠ করেছিলেন৷

১৮৮৫ সাল থেকে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলেও কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন শুরু হয় তার তিন বছর বাদে ১৮৮৮ সাল থেকে ৷ প্রথম বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন হয়েছিল ১৮৮৮ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর৷ মহেন্দ্রলাল সরকার ছিলেন সেবারের সম্মেলনের সভাপতি৷ ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত এই সম্মেলন বসত কলকাতাতেই৷ ১৮৯৫ সালে প্রথম কলকাতার বাইরে সম্মেলন হওয়া শুরু হয়৷ ১৯০৮ সালে কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের ঠিক আগে ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে সুরাটে বসেছিল জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন৷ ৷ ওই অধিবেশনে নরমপন্থী নেতা রাসবিহারী ঘোষ সভাপতি হলেও চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের মধ্যেকার কলহের জেরে সেখানে একেবারে জুতো ছোড়াছুড়ি হওয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল৷ কংগ্রেসের মধ্যে বিভেদ তখন চরমে পৌঁছয়৷

জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এমন ঘটনা ঘটার খবর পাওয়ার পর রীতিমতো বিচলিত হন কবি৷ ইতিমধ্যে কংগ্রেসের বাঙালি প্রতিনিধিরা কলকাতায় ফেরেন- তখন উভয় মনোভাবের প্রতিনিধিরা ভীষণ ভাবে উত্তেজিত ৷ এদিকে তখনই আবার ঠিক হয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন হবে পাবনায় ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি। সুরাটের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখে অপেক্ষাকৃত প্রাদেশিক সম্মেলনে ‘নিরপেক্ষ কোনও ব্যক্তি’কে সভাপতি নির্বাচন করে তা সম্পন্ন করার কথা ভাবেন অনেকে৷

যথারীতি তারজন্য অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়। চাটমোহরের হরিপুরের চৌধুরী বংশের কৃতী সন্তান আশুতোষ চৌধুরী ও যোগেশচন্দ্র চৌধুরী যথাক্রমে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হন। এঁনারা পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’কে সভাপতি হিসাবে স্থির করেন। সেই মতো যোগেশচন্দ্র চৌধুরী শিলাইদহে যান এবং সভাপতিত্ব গ্রহণের জন্য কবিকে আমন্ত্রণ জানান। সেই অনুরোধ ফেলতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।

এই প্রসঙ্গে কবি লিখেছিলেন, ‘‘আমি পদ্মার তীরে নিভৃতে আশ্রয় লইয়াছিলাম৷ আমার ভাগ্যদেবতা সেই সন্ধান পাইয়া এখানেও তাহার এই শিকারটির প্রতি লক্ষ্য স্থাপন করিয়াছেন৷ আমাকে পাবনার শান্তিপ্রিয় লোক কন্ফারেন্সের সভাপতি করিয়াছেন৷ প্রথমে আপত্তি করিয়াছিলাম কিন্তু আপনি তো জানেন কোনদিনই কোন আপত্তি করিয়া আমি জয়ী হই নাই ৷ …….সভাপতি হইয়া শান্তি রক্ষা করিতে পারিব কি না সন্দেহ ৷ দেশে শান্তি যখন নাই তখন তাহাকে রক্ষা করিবে কে? কলহ করিবে স্থির করিয়াই লোকে এখন হইতেই অস্ত্রে শান দিতেছে ৷ যদি অক্ষত দেহে ফিরায়া আসি তো খবর পাইবেন৷’’

সম্মেলনের আগে ও পরে রাজনৈতিক মতামতের জন্য তিরস্কৃত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন কবি৷ ওই সময় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে কবি লিখেছিলেন, ‘‘কনফারেন্স আমাকে সভাপতি পদে আহ্বান করার সংবাদ পাওয়ামাত্র নানা পক্ষ হইতে গালি সংযুক্ত এত বেনামী পত্র পাইতেছি যে, আমি কোন দলের লোক তা স্থির করা আমার পক্ষে কঠিন হইয়াছে৷’’ সেই সব পত্রে এমন ইঙ্গিতও ছিল যাতে সুরাটের মতো পাবনাতেও তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে৷ তবে ওই সব শাসানি কবির জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল সভাপতিত্ব করার ব্যাপারে৷

সম্মেলন স্থানটি ছিল পাবনা শহরের কেন্দ্রস্থলে টমসন টাউন হল সংলগ্ন পেছনের মাঠ (উক্ত স্থানেই পরে বনমালী ইন্সস্টিটিউট নির্মিত হয়)। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তাকে সভাস্থলে নিয়ে পৌঁছলে উপস্থিত প্রায় ছয় হাজার প্রতিনিধি ও জনতা হর্ষধ্বনি দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানান। সুরাট অভিজ্ঞতার কারণে নিরাপত্তার জন্য ছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশে রাখা হয়েছিল। সম্মেলনেরর শুরুতেই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরী স্বাগত ভাষণ দেন। তারপর ব্যারিস্টার আবদার রসুল সভাপতিত্ব করবার জন্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাব সমর্থন করেন শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ ও শ্রীমতিলাল ঘোষ।

অতীতের প্রথা ভেঙে সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় তাঁর ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণের পরপরই প্রথম দিনের অধিবেশন সমাপ্ত হয়। ওই দিনই সন্ধ্যায় বিষয় নির্বাচনী কমিটির বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যরাত অতিক্রম করলে বৈঠক পরদিনের জন্য মুলতবি রাখা হয়। পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে মুলতবি বৈঠক নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।অধিবেশনে স্বদেশি জাতীয় শিক্ষা, বঙ্গভঙ্গ, সালিশি, ধর্মগোলা, ট্রান্সভালে ভারতীয় নির্যাতন, বিচারক ও পুলিশ, পথকর, কার্যকরি সমিতি, কেন্দ্রীয় সমিতি, নমঃ শূদ্র্র, শরীর চর্চা, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, পরবর্তী সম্মেলন, শোক জ্ঞাপন, রাজনৈতিক নিপীড়িতদের সাহায্য ও স্বরাজ বিষয়ে আলোচনা হয়।

সাহিত্যের দিক থেকে পাবনার প্রাদেশিক সম্মেলনের বৈশিষ্ট্য হল সেবারে প্রথম সভাপতির অভিভাষণ বাংলায় ভাষায় রচিত এবং পঠিত হল৷ যা এতদিন পর্যন্ত রেওয়াজ ছিল ইংরেজি ভাষায় করার৷ আর রবি ঠাকুর চিরকালই ছিলেন এই প্রথার বিরুদ্ধে এবং তাই বরাবরই এই রেওয়াজের প্রতিবাদ করে আসছিলেন৷ সভাপতি হয়ে শুধু প্রতিবাদ নয় প্রথাটাই ভেঙে দিলেন কবি৷

তথ্য ঋণ :
রবীন্দ্র জীবনী ও রবীন্দ্র সাহিত্য-প্রবেশক : শ্রীপ্রভাত মুখোপাধ্যায়
পাবনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : হাবিবুর রহমান স্বপন, সোনার দেশ ১১ অগস্ট, ২০১৭
125 glorious years Indian National Congress Commemorative volume ( West Bengal Pradesh Congress Committee)