সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য। তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটা শুধুমাত্র সাহিত্য সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়। এমনকি তার পদার্থবিজ্ঞান থেকে রাশিবিজ্ঞান নিয়ে কেরিয়ার বদলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কবির একটা প্রভাব ছিল। যে কথা প্রশান্তচন্দ্র পরবর্তীকালে উল্লেখ করতেন।

প্রশান্তচন্দ্র লিখেছিলেন, একেবারে প্রথম দিকে তিনি যখন পরিসংখ্যান বা রাশিবিজ্ঞান নিয়ে কাজকর্ম শুরু করেছিলেন তখন সেই ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তার স্ট্যাটিসটিক্যাল ল্যাবরেটরি পরিদর্শনে বহুবার এসেছিলেন বিশ্বকবি। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ‌ একেবারে প্রথম দিকে যারা তার সঙ্গী ছিলেন তাদের সকলের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়েছিল।

আর সেই সময় এই কাজে রবি ঠাকুর সকলকে উৎসাহিত করতেন। নতুন ধরনের কাজ করতে গেলে অনেক রকম বাধা আসে কিন্তু কবি তার কল্পনা শক্তি দিয়ে সেই সময় অনুভব করতে পেরেছিলেন এই নতুন বিষয়টির গুরুত্ব, বলে মনে করতেন প্রশান্তচন্দ্র। ভারতের পরিসংখ্যান বা রাশিবিজ্ঞানের জনক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ছিলেন মূলত পদার্থবিজ্ঞানের লোক।

সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে বহু গবেষণামূলক কাজের পাশাপাশি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ গড়ে তুলেছিলেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট ইনস্টিটিউট। তবে এই প্রতিষ্ঠানটির আঁতুড়ঘর অবশ্য প্রেসিডেন্সি কলেজ। তখন তিনি ওই কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক । ১৯১৫ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র। শেষ কয়েক বছর তিনি ওই কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন।

কিন্তু সে কাজের পাশাপাশি তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন রাশিবিজ্ঞান নিয়ে নানারকম পরীক্ষামূলক কাজ। প্রশান্তচন্দ্র মনে করতেন বহুকাল আগে থেকেই ভারতে রাশিবিজ্ঞানের চর্চা রয়েছে। যা ছিল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও সমাজ চেতনার অনুষঙ্গ হিসেবে। তিনি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র আর আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী-তে পরিসংখ্যানের অনাবিল প্রয়োগ দেখতে পেয়েছিলেন।

তাছাড়া তিনি সঠিক পরিসংখ্যানগত চিন্তাধারার সূত্র খুঁজে পান চতুর্থ শতাব্দীর জৈন দার্শনিক ভদ্রবাহুর যুক্তির বিন্যাসের মধ্যেও। আধুনিক ভারতের রাশিবিজ্ঞান বা পরিসংখ্যানের প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করেছিলেন তিনি গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে। তিনি ১৯১৫ সালে বিলেত থেকে পড়াশোনা করে ভারতে ফিরে আসেন।

ওই সময় তাঁর কাকা প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিওলজির অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র মহলানবিশ প্রশান্তচন্দ্রকে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে পরিচয় করান। অধ্যক্ষ সেই সময়ে তাঁর কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শূন্য পদের জন্য স্বল্প মেয়াদে অধ্যাপনার জন্য লোক খুঁজছিলেন। কারণ তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র প্রফেসররা তখন যুদ্ধের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মহলানবিশ সেই প্রস্তাবে সম্মত হন। তবে তখন তাঁর ইচ্ছা ছিল কিছুদিন অধ্যাপনা করে তিনি কেমব্রিজ ফিরে প্রারব্ধ গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করবেন।

কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজে এতোটাই নিবিষ্ট হলেন যে পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। গত শতাব্দীর বিশের দশকে প্রশান্তচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের এক কোণে পরিসংখ্যানতত্ত্ব গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন। অবশ্যই সেই সময় তাঁর সঙ্গে আরও কয়জন এই বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন।

এরপর ১৯৩১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়। এই উপলক্ষে সেদিনের বৈঠকে প্রশান্তচন্দ্রের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রমথনাথ ব্যানার্জী, ফলিত অঙ্কশাস্ত্র বিভাগের অধ্যাপক নিখিল রঞ্জন সেন। বৈঠকে পৌরোহিত্য করেন বিশিষ্ট শিল্পপতি রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি।

এই শিল্পপতি ছিলেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি (১৯৩১-১৯৩৬)। প্রশান্তচন্দ্র অনুভব করেছিলেন জীবনের নানা বিষয় আর সমস্যা থেকেই গড়ে তোলা যায় রাশিবিজ্ঞানের ধারণা, তত্ত্ব, এবং ব্যবহার। নৃতত্ত্ব, ভাষা চর্চা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বড় নমুনা জরিপ, পরিকল্পনা, কৃষি, জাতীয় আয়, তথ্যপ্রযুক্তি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, সমাজবিদ্যা, জেনেটিক্স সবক্ষেত্রেই এই বিষয়টিকে দরকার।

তিনি বুঝেছিলেন এই রাশিবিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো এক প্রয়োগবিদ্যা। রাশিবিজ্ঞান বিষয়টি গণিত থেকে তত্ত্ব ধার করে নিয়ে হয়ে ওঠা এক স্বতন্ত্র বিজ্ঞান। আধুনিক ভারতের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা মাথায় রেখে ভারত সরকার ২০০৬ সালে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের জন্মদিন ২৯ জুন জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ