সুমন ভট্টাচার্য: সিঙ্গুর কি রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের কাছে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’? নব্বই ছুইছুই এই শিক্ষক যদি সিঙ্গুরের জমিতে নিজেকে বাঞ্ছারাম ভাবতে ভালবাসেন, তাহলে অত্যাচারী জমিদার কে?

মনোজ মিত্রের লেখা ‘সাজানো বাগান’কে যখন ১৯৮০ সালে তপন সিংহ ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ নামক সিনেমায় রুপান্তরিত করেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই জানতেন না চল্লিশ বছর বাদে হুগলির তিন ফসলি জমিতে সেই নাটক পুনরায় অভিনীত হলে, তাকে কি বলা হবে? রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যেহেতু শিক্ষক ছিলেন, তাই তাঁর জানা উচিৎ ছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলে তা আর ইতিহাস থাকে না। ‘ট্র্যাজেডি’ বা ‘কমেডি’ হয়।

অশীতিপর বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করে এমনিতেই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা তাঁদেরই তৈরি নিয়ম ভেঙেছেন। লালকৃষ্ণ আডবানী, মুরলী মনোহর যোশীদের ছেটে ফেলার জন্য তাঁরা যে বলেছিলেন, পঁচাত্তরের বেশি বয়সী কারও সংসদীয় রাজনীতিতে থাকা উচিৎ নয়, সিঙ্গুরে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে মনোনয়ন দিতে গিয়ে তাঁরা সেই নিয়ম ভেঙেছেন। স্বভাবতই যেহেতু সিঙ্গুর সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, তাই কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরিয়াপ্পা গোটা বিষয়টির দিকে নজর রেখেছেন। দক্ষিণের একমাত্র বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরিয়াপ্পারও বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে, এবং দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীন সমীকরণে তিনি একেবারেই মোদী-শাহদের না-পসন্দ। কিন্তু ইয়েদুরিয়াপ্পাকে কি যুক্তিতে এখন সরাবেন মোদী-শাহ? কারণ তাহলেই তো কর্নাটনের কুশলী চানক্য পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করার উদাহরণ দেবেন।

আরও পড়ুন: দার্জিলিংয়ে কেন গেলেন অমিত শাহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল

সিঙ্গুরে মমতাকে বেকায়দায় ফেলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করা বিজেপির অভ্যন্তরীন রাজনীতিকে কতটা সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে, সেই বিতর্ক সরিয়ে রেখে হুগলির এই বহু আলোচিত বিধানসভা কেন্দ্রটিকে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। জমি আন্দোলনের আঁতুরঘর সিঙ্গুরে ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ১০ হাজার ভোটে পিছিয়ে গিয়েছিল। বিজেপির এই চমকপ্রদ উত্থানের পিছনে গোটা রাজ্য জুড়ে যেটা মূল কারণ, সিঙ্গুরও তার ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ বামেদের ভোট রামে যাওয়া। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কি সেটাই ঘটবে? কারণ, বামেদের প্রার্থী তুলনায় নবীন এবং গোটা বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে ঘুরে বেড়াতে তিনি অকৃপণ।

তাহলে সিঙ্গুরের নির্বাচনী সমীক্ষা বা ভাগ্য কিসের উপর নির্ভর করছে? বামের ভোট রামে যাচ্ছে কি না। তার উপরেই নির্ভর করছে রবীনবাবুর এই নাটক ‘ট্র্যাজেডি’ হবে, না ‘কমেডি’। সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের আর এক যোদ্ধা বেচারাম মান্নাকেই যেহেতু তৃণমূল প্রার্থী করেছে, তাই লড়াইটা আসলেই পুরানো বন্ধুত্ব যখন শত্রুতাই রুপান্তরিত হয়ে যায়, তখন যে আকচা-আকচি হয়, তারই মেঠো উপাখ্যান মাত্র।

দক্ষিণবঙ্গের সিঙ্গুরের লড়াইটারই অন্য চেহারা উত্তরবঙ্গের দিনহাটায়। সেখানে একদা অভিষেক ব্যানার্জী অনুগামী নিশীথ প্রামানিক ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুল ধরে ইতিমধ্যেই সাংসদ হয়েছেন, এবার তিনিই আবার বিধানসভাতেও প্রার্থী। আবার একদা কোচবিহারের বড় শক্তি ফরওয়ার্ড ব্লকের বিখ্যাত নেতা কমল গুহের ছেলে উদয়ন গুহ তৃণমূলে যোগ দিয়ে দিনহাটার বিধায়ক। তারই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশীথ প্রামানিকের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন: পরবর্তী ভোটের আগে আরো বেশি করে মেরুকরণের রাজনীতি

দলবদলের অভিজ্ঞতা এবং নতুন দলে গিয়ে সাফল্য পাওয়া, শুধু এই দুটোতেই দিনহাটার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে মিল নয়, মিল আরও অনেক কিছুতে। উদয়ন এবং নিশীথের রাজনৈতিক জীবনে বিমানবন্দরের খুব গুরুত্ব। না, এটা শুধু কোচবিহার বিমানবন্দর চালু করার জন্য দুজনেরই বিবৃতি এবং নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরেই সব ভুলে যাওয়ার প্রবণতার জন্য বলছি না। সেটা তো এতদিনে উত্তরবঙ্গের মানুষ জেনে গিয়েছেন যে কোচবিহার বিমানবন্দর আসলে একটা সোনার পাথরবাটি, যা ভোটের ঢাকে কাঠি পড়লেই রাজনীতিকরা বার করেন, এবং নির্বাচন মিটে গেলেই দায়িত্ব নিয়ে ভুলে যান। উদয়ন এবং নিশীথের জীবনে বিমানবন্দরের গুরুত্ব আসলে এখানেই যে তাঁরা অধিকাংশই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ বিমানবন্দরেই সারেন। উদয়ন গুহ যেমন ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে তৃণমূলের যোগদানের সিদ্ধান্তটা বিমানবন্দরে মমতার সঙ্গে দেখা করেই নিয়ে ফেলেছিলেন, আবার নিশীথও উত্তরবঙ্গ থেকে দিল্লি উড়ে যাওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিক মিহির গোস্বামীকে সোজা বিমানবন্দর থেকেই পাকড়াও করে গেরুয়া শিবিরে নিয়েছিলেন।

উদয়ন বনাম নিশীথের লড়াইয়ে তাহরে চুম্বকটা কি? আমাদের মনে রাখতে হবে ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ বিজেপিকে উজাড় করে দিয়েছিল। এবং কোচবিহার লোকসভার কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামানিক সেই সময়ই দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রে বড় ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাহলে উদয়ন গুহ যদি দিনহাটার বিদায়ী বিধায়ক হন, লোকসভা ভোটের নিরিখে সেখানে এগিয়ে রযেছেন নিশীথ প্রামানিক। এবারের ভোট তাই এই দুজনের কাছেই অন্যের কাছ থেকে ‘অ্যাডভান্টেজ’ ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.