সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘কিস করনে কে সময় নাক বিচ মে নেহি আতি’। থ্রি-ইডিয়ট আমির খানকে চুম্বনের মুহূর্তে করিনা কপুরের বিখ্যাত ডায়লগ। যার অর্থ দাঁড়ায় চুমু খাওয়ার সময় কিন্তু নাক মাঝখানে আসে। এরপরের দৃশ্য ছিল মায়ক নায়িকার দীর্ঘ চুম্বন। কিন্তু রবি ঠাকুর কি ‘ইডিয়টের’ মতো কাজটিই করেছিলেন ? সুন্দরী নারী এবং তাঁর চুম্বনের আবেদনে তিনি কি সাড়া দিয়েছিলেন? হাত ধরে দড়ি টানাটানি খেলা! সেই খেলা কি খেলেছিলেন বিশ্বকবি?

রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের ভালোবাসা এই প্রসঙ্গ উঠলেই সবার প্রথমে উঠে আসে মেজ বৌঠান কাদম্বরী দেবীর কথা। মেজ বৌঠান তাঁর রবিকে চুম্বনজাত কোনও আবেগে জড়িয়েছিলেন কি না জানা নেই কিন্তু অ্যানা সেই আবেগে জড়ানোর চেষ্টায় কোনও ত্রুটি রাখেননি। বিভিন্ন রকমভাবে কাছে পেতে চেয়েছেন তাঁর রবিকে। একবার হাত ধরে সে কি দড়ি টানাটানি খেলা!

ঘটনা ১৮৭৮ সালের। রবীন্দ্রনাথ বিদেশে পড়াশোনা করতে যাবেন। মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাই মনে হয়েছিল বিদেশে যাওয়ার আগে যদি ভাইকে ইংরেজিতে একটু সরগর করে দেওয়া যায় তাহলে বিদেশে গিয়ে অন্তত কমিউনিকেশন করতে ভাইয়ের অসুবিধা হবে না। সত্যেন্দ্রনাথ তখব বোম্বাই থাকছেন। আশ্রয় নিয়েছেন, বন্ধু ডা. আত্মারাম পান্ডুরংয়ের বাড়িতে। সেখানে তিনিও ইংরেজিটা বলতে শিখেছিলেন। তাই ভাইকেও সেই ‘দাওয়াই’ দিতে চেয়েছিলেন।

আসলে আত্মারামের পরিবার তৎকালীন বোম্বাইয়ের ধর্ম ও সমাজ সংস্কারে বড় ভূমিকা ছিল। আর তাঁর বিদেশ ফেরত মেয়ে অ্যানা ইংরেজিতে একদম চোস্ত। তাঁর দায়িত্বেই তিনি ছাড়লেন ভাই রবিকে।

রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতো শিখছিলেন। কিন্তু তার পাশাপাশি অন্য কিছু শেখার সম্ভাবনাও প্রবল হতে শুরু করে। এই যেমন সুন্দরী নারীর আবেদনে সাড়া দিয়ে একটু জড়িয়ে ধরা। বিলেতি কায়দায় ‘ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বিল্পব’ অর্থাৎ চুম্বন এই সব। তিনি না চাইলেও সে সব হয়ে যায় হয়ে যায় ব্যপার। রবীন্দ্রনাথ নিজেই সে কথা লিখেওছেন। বহু কবিতা গল্পে নলিনী (অ্যানাকে এই নামেই ডাকতেন কবি) নামক চরিত্র চলে এসেছে। ১৯২৭ সালের পয়লা জানুয়ারি অতুলপ্রসাদ সেন ও দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে এক আড্ডার মাঝে রবীন্দ্রনাথ তরুণী অ্যানার কথা বলেছিলেন।

কবির কথায়, ‘তখন আমার বয়স বছর ষোলো। আমাকে ইংরেজি কথা বলা শেখানোর জন্যে পাঠানো হ’ল বম্বেতে একটি মারাঠি পরিবারে। সে পরিবারের নায়িকা একটি মারাঠি ষোড়শী। যেমন শিক্ষিতা, তেমনি চালাকচতুর, তেমনি মিশুকে। ওই অল্প বয়সেই সে একবার বিলেত চক্র দিয়ে এসেছি।’ এরপরেই তিনি বলেছেন অ্যানার তাঁর সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ হওয়ার ঘটনা। বিশ্বকবি বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে সে প্রায়ই যেচে মিশতে আসত। কত ছুতো ক’রেই সে ঘুরত আমার আনাচে কানাচে। আমাকে বিমর্ষ দেখলে দিত সান্ত্বনা, প্রফুল্ল দেখলে পিছন থেকে ধরত চোখ টিপে।’

‘একথা আমি মানবো যে আমি বেশ টের পেতাম যে ঘটবার মতন একটা কিছু ঘটছে, কিন্তু হায় রে, সে হওয়াটাকে উস্কে দেওয়ার দিকে আমার না ছিল কোনোরকম তৎপরতা, না কোনো প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব।’ ‘একদিন সন্ধ্যাবেলা সে আচমকা এসে হাজির আমার ঘরে। চাঁদনি রাত। চার দিকে সে যে কী অপরূপ আলো হাওয়া’ কিন্তু কবির মন খারাপ। খালি মন কেমন করছে বাংলাদেশের জন্যে। এমন সময়েই অ্যানা এসে হাজির। কবিকে সে বলে: “আহা, কী এত ভাবো আকাশপাতাল!” এই কথা পরেই সটান কবির খাটে উঠে আসেন রবি প্রেয়সী। কবি ঘটনা আন্দাজ করে কাটাতে চাইছিলেন। কিন্তু অ্যানা ছাড়ার পাত্রী নয়। ভাবখানা এমন যে আজ সে রবিকে চুমু খেয়েই ছাড়বে। হঠাৎ করেই সে বলে “আচ্ছা আমার হাত ধ’রে টানো তো। টাগ অফ-ওয়ারে দেখি কে জেতে?”

রবি ঠাকুর বলেছেন, ‘আমি সত্যিই ধরতে পারিনি, কেন হঠাৎ তার এতরকম খেলা থাকতে টাগ অফ ওয়ারের কথাই মনে পড়ে গেল। এমন কি আমি এ শক্তি পরীক্ষায় সম্মত হতে না হতে সে হঠাৎ শ্লথভাবে হার মানা সত্ত্বেও আমার না হল পুলক রোমাঞ্চ, না খুললো রসজ্ঞ দৃষ্টিশক্তি। এতে সে নিশ্চয়ই আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বিশেষরকম সন্দিহান হয়ে পড়েছিল।” কবি বলেছেন, “শেষে একদিন বলল “জানো কোনো মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে যদি তার দস্তানা কেউ চুরি করতে পারে তবে তার অধিকার জন্মায় মেয়েটিকে চুমু খাওয়ার?”এই বলে চেয়ারে নকল ভাবে ঘুমিয়ে ছিল অ্যানা। নকল ঘুম ভেঙে সে চেয়েছিল তার দস্তানার দিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য! একটিও দস্তানা চুরি করেননি কবি। কাজেই চুমুর মাঝে পড়ল দাঁড়ি।

রবীন্দ্রনাথ যখন ইংরেজিতে পটু হয়ে বিদেশ পাড়ি দেবেন বলে বোম্বাই ছাড়ছেন অ্যানা কাতর আবদার ছিল, ‘একটা কথা আমার রাখতেই হবে, তুমি কোনো দিন দাড়ি রেখো না, তোমার মুখের সীমানা যেন কিছুতেই ঢাকা না পড়ে।’ কিন্তু রবি ঠাকুরের সাহিত্যের পাশাপাশি দাড়িও জগৎ বিখ্যাত। অর্থাৎ অ্যানা – রবির প্রেমের মাঝখানে সর্বশেষ বাধাটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল দাড়ি।

প্রসঙ্গত কবির কাছ থেকে একটা ডাকনাম চেয়েছিলেন অ্যানা। কবি দিয়েছিলেন নলিনী। কবি এবং নলিনীর এই অদ্ভুত সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া প্রযোজনায় সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল। ছবির নাম ছিল ‘নলিনী’। পরিচালনা করছিলেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। ছবির নামভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল প্রিয়াঙ্কা চোপড়ারই। ছবিটি বাংলা আর মারাঠি ভাষায় তৈরি হওয়ার কথা ছিল। ছবির শ্যুটিং শুরু হয়েছিল বিশ্বভারতী ক্যম্পাসেই। তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।