নারায়ণ চৌধুরী: ( GMPR,সানি বিজয় ইন্টারন্যাশনাল)

ঝুঁকি নিয়ে থেকে গিয়েছি পুরীতে৷ চিত্রগ্রাহক হিসেবে ক্যামেরার মেমোরি চিপ ভরে গিয়েছে ফণী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ঙ্কর মুহূর্ত৷ এটা হয়ত একটা ভয়ানক অভিজ্ঞতা হয়েই থাকল৷ ঝড় থেমেছে প্রকৃতি শান্ত হয়েছে আবার৷ বিধ্বস্ত মন্দির শহরের কিছু এলাকায় ঘুরছি৷ এ এক তথৈবচ পরিস্থিতি৷ প্রকৃতি দানবের হামলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে উপড়ে পড়েছে জনজীবন৷ ঠিক যেন ভেঙে যাওয়া পাখির বাসা৷ তবুও বাঁচতে হবে-এই চরম চাহিদা থেকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করেছেন পুরীর নাগরিকরা৷ সাগর উত্তাল৷

টানা দু দিন ফোনের কানেকশন ছিল না৷ আজ সকালে যখন kolkata24x7 এর সঙ্গে কথা বললাম৷ তখন বারে বারে জানতে চেয়েছি আমার শহর বর্ধমানের কী অবস্থা৷ সেখানে কি ফণী আছড়ে পড়েছিল ? স্বস্তি পেলাম তেমন কিছু হয়নি শুনে৷

পুরীর অবস্থা কী ভয়ানক তা বলে বোঝানো কঠিন৷ এখানে অন্যান্য সময়ে বেআইনিভাবে ‘কাটা তেল’ বিক্রি হয়৷ বাইক ও অন্যান্য গাড়ির চালকরা বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ঝুপড়ি দোকান থেকে কাজ চালানোর জন্য পেট্রোল-ডিজেল কেনেন৷ পুরীর জনজীবনকে সচল রাখতে এই ‘কাটা তেল’ এখন বড় ভরসা৷ কারণ সব পেট্রোল পাম্প বন্ধ৷ ঝড়ে বিধ্বস্ত সৈকত শহরে এই কাটা তেলের দাম লিটার প্রতি ১০০টাকা ছাড়িয়ে যাবে৷ সবাই তাই কিনছেন৷ কিছু করার নেই৷ কিন্তু তাও কতক্ষণ মিলবে কেউ জানে না৷ ফলে দাম বাড়ছেই৷

বাইকটা নিয়ে একটু বেরিয়েছিলাম হোটেল থেকে৷ রাস্তায় রাস্তায় দেখি ভাঙাচোরা গাড়ি উড়ে এসে ছিটকে পড়ে রয়েছে৷ যেন একটা দৈত্য এসব নিয়ে বল লোফালুফির খেলা খেলছিল৷ বাস্তবিক তাই হয়েছে৷ ফণী ঝড়ের গতি বলে দেবে কী বিপদটাই না গেল পুরীর উপর দিয়ে৷ একটার পর একটা বাড়ি ধসে পড়েছে৷ শহরের মোড়ে মোড়ে উল্টে পড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল হোর্ডিং৷ বিখ্যাত স্বর্গদ্বার বিচ থেকে আসার পথে দেখলাম ধংস কী বস্তু৷ তবু রক্ষে সাগর তীরের বড়বড় হোটেলগুলো ভেঙে পড়েনি৷

আমি যে হোটেলের কর্মী, সেখান থেকে ৫ মিনিট হাঁটলেই বঙ্গোপসাগরের খোলামেলা নির্জন সৈকত৷ খুব সকালে প্রবল হাওয়ার মাঝে সেখানে গিয়েছিলাম৷ দূরে দেখি মাঝ ধরার ডিঙ্গিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে উল্টে৷ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘বালুশিল্পী’ সুদর্শন পট্টনায়েকের ঝাউগাছে ঘেরা প্রকৃতির স্টুডিও দেখে খারাপ লাগল৷ বালি দিয়েই তো তাঁর কারুকার্য বিশ্বকে চমকে দিয়েছে বারে বারে৷ সেই বালির স্থাপত্য তো এমনিই ভেঙেই যায়৷ নতুন করে গড়েন শিল্পী৷ এবার না হয় ফণী ঝড়ের কবলে সেসব চুরমার হয়ে গিয়েছে৷ তবু আশা তিনি শিল্পী, নতুন করে সব গড়ে নেবেন৷

ফণী আছড়ে পড়ার আগে কলকাতা ২৪-কে শেষ যে সংবাদ পাঠিয়েছিলাম তাতে বলেছিলাম-ভয়ঙ্কর মুহূর্ত নিয়ে তেড়ে আসছে সামুদ্রিক ঝড়৷ সেটা সাগর তীরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি৷ যখন সত্যি করেই সেটা এলো তখন আর কিছু করার ছিল না৷ আমাদের হোটেলের সব ঘর তছনছ৷ কোনরকমে এখানে থাকা বাকিরা প্রাণে বেঁচেছেন৷ আশে পাশের সব হোটেলের একই পরিস্থিতি৷

ধংসের বেলাভূমি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে পুরী প্রশাসন৷ উদ্ধারকাজ চলছে৷ তবে বিদ্যুৎহীন পুরো পুরী৷ এই অবস্থা চলবে আগামী কয়েকদিন৷ ফোনে কথা বলার মাঝে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ওপারে বাংলাদেশের পরিস্থিতি শুনলাম৷ সেখানে তো একটার পর একটা জনপদ মিশে গিয়েছে মাটিতে৷ মারা গিয়েছেন অনেকে৷ পুরীতেও ঝড়ের পর আসছে মৃত্যু মিছিলের সংবাদ৷

এই অবস্থাতে কীই বা করার আছে৷ তবুও ওডিশা রাজ্য সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে৷ আমি রয়েছি নেশার টানে ফণীর তাণ্ডবকে ক্যামেরায় বন্দি করতে৷

(অনুলিখনে প্রসেনজিৎ চৌধুরী)