তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফের কনভয়ে আত্মঘাতি সন্ত্রাসবাদী হানায় শহিদ হয়েছেন কমপক্ষে ৪২ জন জওয়ান৷ তার মধ্যে রয়েছেন এই বঙ্গেরই দু’জন। বৃহস্পতিবারের এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড়।

২০১৩ সালে এই কাশ্মীরেই এক জঙ্গি হানায় শহিদ হয়েছিলেন বাঁকুড়ার তালডাংরার পাঁচমুড়ার সেনাবাহিনীর কর্মী অদ্বৈত নন্দী। সাম্প্রতিক এই নৃশংস ঘটনার পর কি ভাবছেন শহিদ অদ্বৈত নন্দীর পরিবার, কেমন আছেন তারা, তা জানতেই আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম তাঁর পাঁচমুড়া গ্রামের বাড়িতে।

কাশ্মীরে ফের জঙ্গি হানায় তরতাজা ৪২ জওয়ানের মৃত্যুতে সারা দেশের সঙ্গে শোকস্তব্ধ পাঁচমুড়ার ‘শহিদ’ অদ্বৈত নন্দীর পরিবারও। বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধ বাবা আর এক ছোট ভাই। টিভিতে এই ঘটনার ছবি দেখার পর তাদের চোখের সামনে বার বার ফিরে আসছে সেই ২০১৩ সালের অভিশপ্ত ২৪ জুন তারিখটি।

পেশায় কৃষক বাবা সুশীল নন্দী, সেই সময় স্কুল পড়ুয়া ছোট ভাই অসীম নন্দীকে বাড়িতে রেখে ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তরতাজা যুবক অদ্বৈত নন্দী। আগেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে। পরে ২০১২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিউ নন্দীকে বিয়ে করেন তিনি। সব ঠিক ঠাক চলছিল।

অদ্বৈত নন্দীর পরিবার সূত্রে খবর, এর মধ্যেই কাশ্মীরের একটি নব নির্মিত রেলওয়ে স্টেশান উদ্বোধন করতে সেখানে পৌঁছানোর কথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর। আর সেকারণেই জম্মুর হায়দারপুরে আরো অনেকের সাথে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন এই সেনাকর্মীও।

সেখানেই জঙ্গীদের অতর্কিতে মোটরবাইক থেকে গুলি চালানোর ঘটনায় অদ্বৈত নন্দী সহ আট সেনা কর্মী ঘটনাস্থলেই শহিদ হন। এই ঘটনার সময় তার নববিবাহিতা স্ত্রী পিউ বাপের বাড়িতে ছিলেন। দুঃসংবাদ পেয়েই বাবা মায়ের সঙ্গে ছুটে আসেন পাঁচমুড়ার বাড়িতে। কিন্তু স্বামীকে হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গভীর রাতে সবার চোখের আড়ালে বাথরুমে ঢুকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেন তিনি। এই ঘটনায় সেসময় পাঁচমুড়া এলাকার গণ্ডী ছাড়িয়ে জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে আগেই। জঙ্গি হানায় মৃত্যু হল বড় ছেলের। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিল বৌমাও। এভাবে একের পর শোক সামলে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে শহিদ অদ্বৈত নন্দীর বৃদ্ধ বাবা সুশীল নন্দীর পক্ষে। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

তবুও বাড়ির সামনে ছেলের আবক্ষ মূর্তিতে এখনো নিয়ম করে মালা দেন অশীতিপর এই বৃদ্ধ। আর ছোট ভাই অসীমের সেনাবাহিনীর পোশাকে দাদার ছবি হাতে নিয়েই দিন কেটে যায়। দাদা, বৌদি আর বাবাকে নিয়ে যেখানে তার আনন্দে কাটানোর কথা, সেখানে এই অবস্থায় তাকে এক বুক নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

বাড়িতে বসে সেদিনের সেই অভিশপ্ত দিনটার বর্ণণা দিতে গিয়ে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছিল শহিদ অদ্বৈত নন্দীর ভাই অসীমের৷ কোন রকমে নিজেকে সামলে পুলওয়ামার ঘটনার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়। শুধু কোন একটি পরিবারের নয়, এই ক্ষতি সমগ্র দেশ ও জাতির। সরকারের তরফে যতোই সাহায্য করা হোক এ ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। একই সঙ্গে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর না হয়, সরকারের কাছে সেই আবেদন রাখেন তিনি৷

আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের তরফে কেউই খবর পর্যন্ত নেয়না কেমন আছেন শহিদ পরিবারের মানুষ গুলি। একই সঙ্গে জঙ্গি দমনে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে’র প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অসীম নন্দী বলেন, দেশের এই সব শত্রুদের চিরতরে বিনাশ জরুরি।