পূর্ব বর্ধমান: দেখতে দেখতে দু’শো বছর পার করেছে বর্ধমানের ব্যানার্জী বাড়ির দুর্গাপুজো৷ শতাব্দী প্রাচীন এই পুজো ঘিরে শোনা যায় নানা গল্প৷ এলাকার লোকজনের এই পুজো ঘিরে ভক্তি আজও একইরকম অটুট৷

আরও পড়ুন: অন্ধ্রে তিতলি প্রাণ কাড়ল আট জনের

বর্ধমানের বেড়মোড়ের বাসিন্দা বিমলেন্দু বন্দোপাধ্যায়ের কথায়, এই পুজো নিয়ে তাঁরা যে দলিল পেয়েছেন তা থেকে জানা যায় এই বাড়ির পুজোর বয়স ২০০ বছরের বেশি৷ এলাকায় বারোমেসে দুর্গাপুজো হিসাবেই পরিচিত। একসময় বেড়মোড় এলাকায় নন্দী বংশের জমিদারি ছিল৷ তারাই এই পুজোর প্রচলন করেন৷

দেবী এখানে হর-পার্বতী। একচালার কাঠামোয় পার্বতী এবং শিব উভয়েই বসে রয়েছেন ষাঁড়ের উপর। তার দু’পাশে রয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এছাড়াও রয়েছে দেবীর অষ্টসখী। এখানে দেবীর সঙ্গে সিংহ, অসুর থাকে না৷

কথিত আছে, একসময় নন্দী বংশে কোনও পুত্রসন্তানের জন্ম হচ্ছিল না৷ এ নিয়ে সমস্যায় পড়েন নন্দী পরিবারের লোকজন৷ সেই সময় নন্দী পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল বন্দোপাধ্যায়দের। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ তারেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের হাতে এরপর পুজোর যাবতীয় দায়ভার তুলে দেন নন্দীরা। সেই থেকেই এই পুজো ব্যানার্জী বাড়ির পুজো হিসাবে পরিচিতি পায়৷

১৯৮৩ সাল থেকে পারিবারিক সূত্রে পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন বিমলেন্দুবাবুরা৷ বিমলেন্দুবাবুর ভাইপো সৌম্য বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ১৯৭৮ সালে ভয়াবহ বন্যা হল৷ সে সময়ও মায়ের পুজোয় কোনও ছেদ পড়েনি৷ দু’বেলা ভক্তিভরে মাকে স্মরণ করেছেন এ পরিবারের লোকজন৷

আরও পড়ুন: বড়সড় পাইথন এলাকায়, আতঙ্কে পিটিয়ে মারল গ্রামবাসীরা

এমনকী এ পরিবারে কেউ মারা গেলে, অশৌচের বিষয় এলে তখনও অন্য কাউকে দিয়ে পুজো করানো হয়। দু’বেলা নিত্যপূজো কখনই বন্ধ হয় না৷ তাই জন্য এলাকার লোকজনের কাছে এই পুজো বারোমেসে দুর্গা পুজো নামেও পরিচিত৷

বিমলেন্দুবাবু জানান, ব্যানার্জীবাড়ির এই দেবীকে নিয়ে অনেক গল্পও প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন ব্যানার্জীবাড়ির দেবী দুর্গা বড়দিদি। কারণ, রীতি মেনে এই বাড়ির সন্ধিপুজোয় বলির পর এই এলাকার আরও দু’টি পারিবারিক পুজোয় (যা দেবীর দুই বোন বলে পরিচিত) বলি হয়।

এমনকী অন্য পারিবারিক পুজোর (দাসবাড়ি ও পরামাণিক বাড়ির) প্রতিনিধিরা আসেন ব্যানার্জী বাড়িতে। সেখান থেকে তাঁরা পুরানো চাঁদমালা এবং পুষ্প সংগ্রহ করে নিয়ে যান। বিজয়ার পর ফের তাঁরা আসেন। তখন তাঁদের হাতে ১ টাকার কয়েনে সিঁদুর মাখিয়ে পুষ্প দিয়ে দেওয়া হয়। এটাকে বলা হয় যাত্রা। সৌভাগ্যের যাত্রা হিসাবেই এর পরিচিতি৷

ব্যানার্জী বাড়ির দুর্গাপুজোয় বেশ কিছু আচার রয়েছে৷ যেমন অষ্টমী ও নবমীতে দুটি পাঁঠা বলি হয়। এছাড়াও সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত আখ, চালকুমড়ো, গোঁড়া লেবু বলি হয়। দশমীতে হয় ঝিঙে বলি। তবে ব্যানার্জী বাড়ির দুর্গাপুজোয় সব থেকে বড় বিশেষত্ব হল মাকে প্রতিবছর তৈরি বা বিসর্জন দেওয়া হয় না।

আরও পড়ুন: “মেয়েদের বিকিনি পরিয়ে সেক্সি পোজে ছবি তুলত”

সূত্র বলছে, এখনও পর্যন্ত পুজো প্রচলনের পর মাত্র দু’বার দেবীর কাঠামোকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালে বিসর্জন হয়েছিল৷ বিমলেন্দুবাবু জানিয়েছেন, দেবী মূর্তি নষ্ট হয়ে গেলে তবেই প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। দেবীর মন্দিরের সামনেই রয়েছে পুকুর৷ সেখানেই বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা৷